দাবা - ৬৪ খোপের ইতিবৃত্ত

রাজা থেকে শুরু করে মন্ত্রী, ঘোড়া, সেনা সবই আছে। তবে তা খোলা মাঠে না থেকে আছে ৬৪ খোপের একটা চৌকো বোর্ডে। তীক্ষ্ণ বুদ্ধির জোরে খেলতে হয় এই খেলা। এই খেলার মাধ্যমে জ্ঞানের বিকাশ হয়, বাড়ে মনসংযোগ। হ্যাঁ দাবা খেলার কথাই বলছি।

১৮তম বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়ানশিপের খেতাব জিতলেন মাত্র ১৮ বছর বয়সী ভারতীয় দাবাড়ু গুকেশ ডোমারাজু। চীনের ডিং লিয়েনকে ১৪ ম্যাচের খেলায় পরাস্ত করে চ্যাম্পিয়নের শিরোপা অর্জন করলেন। এর আগে বিশ্বনাথন আনন্দ প্রথম ভারতীয় দাবাড়ু হিসাবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে এতো আলোচনা দাবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ানশিপ ঘিরে সেই দাবার জন্মস্থানই কিন্তু আমাদের ভারতবর্ষ। খ্রিস্টীয় ৭ শতকে অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ১৪০০ বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে দাবা খেলা চালু হয়। অনেক গবেষক দাবি করেন ষষ্ঠ শতাব্দীর আগেই ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময়কালে ‘চতুরঙ্গ’ নামে দাবার মতোই এক খেলার উৎপত্তি হয়। অনেক লোককথাও প্রচলিত আছে খেলাটি ঘিরে। তবে দাবার মতো এক ধরণের খেলার সন্ধান পাওয়া যায় প্রাচীন মিশরে ক্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে, যার নাম ছিল শতরঞ্জ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মধ্যে এই খেলা সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে রাশিয়ায়। আনাতোলি কারপভ, গ্যারি কাসপারভের মতো একের পর এক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান দাবাড়ু উঠে আসেন রাশিয়া থেকে। ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই খেলা। উনিশ শতকের শেষ দিকে দাবার আধুনিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সময়টা ১৮৫১ সালে। যার জনক উইলহেম স্টেইনজ। লন্ডনে অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টটি আয়োজন করেন ব্রিটিশ দাবাড়ু হাওয়ার়্ স্ট্যাউনটন। টুর্নামেন্টটিতে চ্যাম্পিয়ন হন জার্মানির অ্যাডলফ অ্যান্ডারসন। দাবা খেলার অগ্রগতির জন্য বিংশ শতকে বিশ্ব দাবা ফেডারেশন (FIDE) প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীকালে UNESCO র প্রস্তাব অনুসারে ১৯৬৭ সালে থেকে প্রতিবছর ২০ জুলাই আন্তর্জাতিক দাবা দিবস পালন করা হয়ে থাকে।

আপাদমস্তক ক্রিকেট-ফুটবলপাগল দেশ ভারত। অন্য যে কোনও খেলাই এখানে ‘আদার স্পোর্টস’! কিন্তু বর্তমানে বিশ্বনাথন আনন্দের দেশে দাবা নিয়ে আগ্রহ ও জনপ্রিয়তা কিন্তু বেড়ে চলেছে। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী ভারতে মোট ৮৫ জন গ্র্যান্ডমাস্টার ছাড়াও ১২৪জন ইন্টারন্যাশানাল মাস্টার ২৩ জন মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার ও ৪২ জন মহিলা ইন্টারন্যাশানাল মাস্টার আছে। এ বছরই ৪৫ তম অলিম্পিয়াডে দেশের মুখ উজ্জ্বল করলেন ভারতের দাবার তারকারা। এই প্রথমবার ভারতের পুরুষ ও মহিলা দল এই আসরে সোনা জিতল!  রমেশবাবু প্রজ্ঞানন্দ ও ডি গুকেশদের পাশাপাশি দিব্যা দেশমুখ ও তানিয়া সচদেবরাও দুরন্ত দাবা খেলে জিতে নিলেন সোনা! আর এরই রেশ ধরে ১২ ই ডিসেম্বর বিশ্ব দাবাতে চ্যাম্পিয়ন হলেন ডি গুকেশ। তার এই সাফল্য দেশের দাবার জনপ্রিয়তাকে যে আরো বাড়িয়ে তুলবে তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।