আবুল বরকত ও ২১ শে ফেব্রুয়ারি
রাজীব ঘাঁটী
১৯৫২ সালে বাংলাদেশের ঢাকা শহরে যে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল,সেখানে ৫ জন শহীদ হয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে। এই পাঁচজন ভাষা শহীদদের মধ্যে একজন ছিলেন আবুল বরকত তাঁর বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বাবলা গ্রামে। সালার থানার অন্তর্গত বাবলা গ্রাম। যদিও ভারতবর্ষ থেকে পৃথক হয়ে ততদিনে বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিতি লাভ করেছে। তা সত্ত্বেও বরকত কেন পড়তে গেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে? জানার খুব ইচ্ছে ছিল।
২০১৩ সালে আমার সৌভাগ্য হয়েছিল বাবলা গ্রামের সেই মাটিতে পা রাখার, সেই পবিত্র মাটি ছুঁয়ে দেখার যেখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আবুল বরকত। গ্রামে ঢুকে জানতে পারলাম আবুল বরকত এর নামে একটি সংগ্রহশালা করা হয়েছে তৎকালীন সাংসদ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের উদ্যোগে এটি নির্মাণ হয়েছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পড়ো বরকতের কোন ছবি পাওয়া গেল না, আমি আবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। পরে এক ভদ্রলোক তড়িঘড়ি করে বরকতের একটি ছবি এনে ওখানে রাখার ব্যবস্থা করলেন। তারপর ঐ ভদ্রলোক আমাদের নিয়ে গেলেন বরকতের বাড়িতে, জানা গেল সেই বাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে। বেশ বড় তিনতলা বাড়ি। যিনি বাড়িটি কিনেছেন সচেতনভাবেই বাড়ির সদর দরজায় লেখা বরকতের পরিবারের নাম আড়াল করেছেন এবং তার কঠোর আপত্তিতে আমাদের সেই বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হল না। এরপর গ্রামের মানুষরা আমাকে এবং আমার সাথে যারা গেছিলেন তাদের ঘিরে কথাবার্তা বলতে লাগলেন। জানতে পারলাম বরকত তাঁর মামার বাড়িতে পলিটিক্যাল সায়েন্স এ মাস্টার্স করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়েছিলেন। ভাবতে অবাক লাগে ১৯৫২ সালে একটি প্রান্তিক জনপদ বাবলা গ্রাম সেখান থেকে একটি ছেলে পলিটিক্যাল সায়েন্স এ মাস্টার্স পড়ে। অর্থাৎ তাঁদের ফ্যামিলি উৎকর্ষতা কতটা উচ্চমানের তা সহজেই বুঝতে পারলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্র অবস্থায় ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে এক ভাষা সৈনিকের ভূমিকা পালন করেন বরকত।
পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তিনি শহীদ হন। গ্রামবাসীরা প্রত্যেক বছর নিয়ম করে ২০শে ফেব্রুয়ারি রাত্রি বারোটা থেকে একটি মশাল মিছিল বাবলা গ্রাম সহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলি পরিক্রমা করে। পরিক্রমা শেষে বরকতের নামে যে সংগ্রহশালা, তার সামনে পতাকা উত্তোলন করে শুরু হয় একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন এই অনুষ্ঠান চলে সকাল অবধি।
মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম এই কথা। শুনে ইচ্ছে ছিল কোন এক বছর ঠিক পৌঁছে যাব এই আয়োজন দেখতে কিন্তু আজও সেই অনুষ্ঠানে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
এরপর ওই ভদ্রলোক বাড়ি বিক্রির অর্থাৎ বরকতের বাড়ি বিক্রির যে দলিল তার জেরক্স কপি আমার হাতে তুলে দিলেন। সেটি যত্ন সহকারে আমার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। ওই দলিলে বরকতের মায়ের বক্তব্য পড়লে চোখের কোন ভিজে আসে। চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে সন্তানহারা মায়ের আর্তনাদ।
১৯৫২ সালের সেই ভাষা আন্দোলন শুধু একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে নয় সারা বাংলাদেশ জুড়ে যেমন হয়েছিল সেখানে প্রত্যেকটি বাঙালির ভূমিকা ছিল তেমনি তার ঢেউ আছড়ে পড়েছিল পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে। গর্ব শুধু এইটুকুই যে বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ বলিদান দিয়ে আমরা আদায় করতে পেরেছি একটা দিন বাঙালির, বাংলা ভাষার ।
সেই ২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পেয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির এবং বাংলা ভাষার গর্বের একটি অধ্যায়।
অবশেষে বলি বরকতের বন্ধু আবদুল গাফফার চৌধুরীর সেই লেখা—
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি”