বিস্মৃত বিপ্লবী, গোপীমোহন
রবিব্রত ঘোষ
দিনটা ছিল ১২ জানুয়ারি, সাল ১৯২৪। স্থান কলকাতা। শীতের সকাল। চারিদিকে লোকজন কম শীতের চাদরে মোড়াকলকাতা, তা তো আর এখনকার মত নয় প্রায় আজ থেকে একশো বছর আগেকার অবস্থা। ঘড়িতে তখন সকাল সোয়া সাতটা, থেকে বড়জোর সাড়ে সাত। সাদা ধুতি আর ঝোলা আর খাকি শার্ট পরনে গোপীমোহন দাঁড়িয়ে রয়েছেন পার্ক স্ট্রিট আর চৌরঙ্গি রোডের সংযোগস্থলে। আজ তার অগ্নিপরীক্ষা। দীর্ঘদিন ধরে যে স্বপ্নকে যত্নে লালিত পালিত করেছে জীবন উৎসর্গ করবে বলে স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেই স্বপ্নকে সাকার করার দিন।গোপী মনের মধ্যে একটা চাপা উদ্বেগ নিয়েই ঘোরাঘুরি করছেন ইতস্তত। উত্তেজনায় টানটান রয়েছে অত্যন্ত সজাগ রয়েছে স্নায়ু আর সে জানে লক্ষ্য করতে না পারলে গেলে পস্তানো ছাড়া আর কোন উপায় নেই। বরং কোন না কোনভাবে যদি জানাজানি হয়ে যায় তারে প্রবল অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হবে। উত্তেজনায় টানটান হয়েই অপেক্ষা করতে থাকে তখনকার পুলিশ কমিশনার খুবই কুখ্যাত টেগার্টকে অসতর্ক মুহূর্তে পেয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে। সাহেব অতি ধূর্ত। রোজ মর্নিং ওয়াকে বেরোন না। যে ক’দিন বেরোন, রোজ আলাদা রাস্তা দিয়ে ফেরেন। তা ছাড়া সাদা পোশাকের দেহরক্ষীরা থাকেই আশেপাশে।
স্নায়ু হঠাৎই সজাগ হয়ে ওঠে গোপীর। আরে, মোড়ের বড় দোকান ‘হল এন্ড অ্যান্ডারসন’-এর সামনে কে দাঁড়িয়ে উনি? দোকান খোলেনি এখনও, বাইরে থেকেই কাচের শো-কেসে সাজিয়ে রাখা জিনিসপত্রে চোখ বোলাচ্ছেন দীর্ঘদেহী ভদ্রলোক। কে উনি? কাছে গিয়ে পিছন থেকে এক ঝলক দেখেই নিশ্চিত হয়ে যান গোপী। এ তো স্বয়ং টেগার্ট! দাঁড়ানোর ওই ভঙ্গি তার ভীষণ পরিচিত। খয়েরি রঙের লম্বা ওভারকোটটাও। অবশেষে! অবশেষে নাগালের মধ্যে প্রবল পরাক্রমী পুলিশ কমিশনার! উত্তেজনার বশে এক মুহূর্তও দেরি করলেন না গোপীমোহন। সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন কয়েক হাত পিছনে, তড়িঘড়ি চাপলেন ট্রিগার। টেনশনে গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। আওয়াজে সচকিত সাহেব ঘুরে তাকানোর আগেই ফের ছুটল বুলেট। এবার লক্ষ্যভেদ। ফুটপাথে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা দেহের উপর অবিরাম গুলি বৃষ্টি চলতেই লাগলো।
ততক্ষণে লোক জমে গেছে আশেপাশে। এবার গোপীর সম্বিত ফিরল বুঝতে পারলেন আর দেরি নয় দ্রুত এখান থেকে পালিয়ে যেতে হবে। পার্ক স্ট্রিট ধরে ছুটলেন গোপী। ধাওয়া করলেন কিছু পথচারী, পিছু নিল একটি ট্যাক্সিও। যা লক্ষ্য করে গোপী গুলি ছুড়লেন, পথচলতি একটি মোটরগাড়ি থামিয়ে চেষ্টা করলেন উঠতে। চালক অসম্মত হতে গুলি চালালেন ফের। লক্ষ্যভ্রষ্ট হল বুলেট। একটি ঘোড়ার গাড়ির পাদানিতে উঠে পালানোর শেষ চেষ্টা ব্যর্থ হল। ধরে ফেলল পুলিশ। গোপীর কাছ থেকে উদ্ধার হল একটি বড় পিস্তল, একটি রিভলভার এবং চল্লিশটি তাজা কার্তুজ।
এরপর লালবাজারে নিয়ে যাওয়া আর সেই ফাঁকে এক দফা বেদম মারধোর। তারপর আসামিকে সোজা নিয়ে যাওয়া হল নগরপালের ঘরে। এবং ঢুকেই পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল গোপীমোহনের। ভূমিকম্পের থেকেও প্রবল আঘাত। আশ্চর্য রকমের ভূত দেখার মত চমকে উঠল গোপী কমিশনারের চেয়ারে স্বমহিমায় বসে টেগার্ট! যাঁকে একটু আগেই বুলেটে বুলেটে ঝাঁঝরা করে দিয়ে এসেছেন প্রকাশ্য রাজপথে!
স্তব্ধবাক্ বিস্মৃত হতাশ গোপীমোহনের দিকে তাকিয়ে তখন বিদ্রুপের হাসি ছুড়ে দিচ্ছেন কমিশনার— ‘সো ইউ থট ইউ’ড কিলড্ চার্লস টেগার্ট’ (So you thought you’d killed Charles Tegart?)
গোপী অচিরেই বুঝলেন, মারাত্মক ভুল করে ফেলেছেন। টেগার্ট ভেবে খুন করে ফেলেছেন অনেকটা তাঁরই মতো দেখতে এক নিরপরাধ ইংরেজ নাগরিককে। নাম ‘আর্নেস্ট ডে’ (Ernest Day), এক বেসরকারি সংস্থার আধিকারিক। মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই। সামনে প্রবল অন্ধকার গোপী, বসে পড়েন মুখ ঢেকে। একটা নির্দোষ লোককে মেরে ফেললাম, আর টেগার্টের শরীরে এবারও আঁচড়টুকুও কাটা গেল না?
পরের দিনের খবরের কাগজে শিরোনাম, ‘মিসটেকেন আইডেন্টিটি সেভ্স টেগার্ট’ (Mistaken identity saves Tegart), আর বাংলা কাগজে, ‘দৈবক্রমে স্যার চার্লস টেগার্টের জীবনরক্ষা। চৌরঙ্গীর উপর মিঃ আর্নেস্ট ডে নৃশংসভাবে নিহত। গোপী সাহা নামে একজন যুবক ঘটনাস্থলে ধৃত’।
গোপীনাথ সাহার বিচার শুরু হয় ১৪ই জানুয়ারি চীফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে। এই সময়ে আনন্দবাজার পত্রিকাতে চৌরঙ্গী হত্যাকান্ড শিরোনামে এই মামলার বিবরণ এবং গোপীনাথের নির্ভীক বক্তব্য প্রকাশিত হত। আদালতে দাঁড়িয়ে গোপীনাথ স্বীকার করেন যে ভারতের মুক্তি সংগ্রামের বিষাক্ত কাঁটা টেগার্ট সাহেবকে তিনি হত্যা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দেশ ও জাতির শত্রুকে হত্যা করার পরিবর্তে তাঁর মতো দেখতে এক নির্দোষ সাহেবকে তিনি হত্যা করেছেন। তিনি আদালতে টেগার্টের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি হেসে বলেন যে টেগার্ট সাহেব হয়তো ভাবছেন যে তিনি নিরাপদ, কিন্তু তাঁর আরম্ভ করা কাজ পূর্ণ করার জন্য ভারতবর্ষে অসংখ্য তরুণ আছে। এই মামলাতে আরো অনেক বিপ্লবী জড়িয়ে পড়তে পারতেন। কিন্তু সাহসী গোপীনাথ সমস্ত দোষ নিজের কাঁধে তুলে নেন এবং অন্যদের আড়াল করেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পরামর্শে বেশ কয়েকজন আইনজীবী গোপীনাথের পক্ষে সওয়াল করেন, কিন্তু গোপীনাথের নির্ভীক এবং সুস্পষ্ট স্বীকারোক্তির কারণে তাঁদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। অবশেষে গোপীনাথের প্রাণদণ্ডের আদেশ হয়। এই আদেশ গোপীনাথকে দুঃখিত করতে পারেনি; উপরন্তু তিনি আদালতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেন যে তাঁর প্রত্যেক রক্তবিন্দু যেন ভারতের ঘরে ঘরে স্বাধীনতার বীজ বপন করে। মৃত্যুর দিনদুয়েক আগে প্রেসিডেন্সি জেলের প্রহরীর থেকে গোপী চেয়ে নিয়েছিলেন কাগজ-কলম। শেষ চিঠি লিখেছিলেন গর্ভধারিণীকে— শ্রীচরণেষু মা, সর্বশক্তিমানের কাছে প্রার্থনা কোরো ভারতের প্রতিটি সংসার যেন তোমার মতো মা লাভ করে ধন্য হয় আর তাঁরা যেন তোমার গোপীর মতো সন্তান প্রসব করেন, যারা অক্লেশে প্রাণ দেবে দেশের জন্য।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন ধার্য হয়েছিল ১৯২৪-এর পয়লা মার্চ।
এই আত্মত্যাগ আত্ম বলিদান মানে, সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয় বরং আরো নতুনভাবে জেগে ওঠা গোপীনাথের এই মৃত্যু বাংলায় নতুন আগুন জ্বালিয়ে দিতে পেরেছিল। যাতে বৃটিশ শাসকেরা বুঝতে পেরেছিল ওকে সামাল দেয়া অনেক কঠিন। কথা ছিল, ফাঁসির পর মরদেহ নিয়ে নেতাজির নেতৃত্বে নগর পরিক্রমা করা হবে। পরে শ্মশানঘাটের উদ্দেশে যাত্রা। কিন্তু, গোপীনাথের ফাঁসিতে ক্ষোভের আঁচ পাচ্ছিল ব্রিটিশ শাসক। অগ্নিগর্ভ অবস্থা দেখে ইংরেজ সরকার ভয়ে কারাগারের ভিতরেই তাঁর শেষকৃত্য করেন। শোনা যায়, ফাঁসির পর নেতাজি গোপীনাথের উত্তরীয় জোগাড় করেন। পরে তা মাথায় জড়িয়ে হরিশ পার্কে মিছিল করেন। পরদিন নেতাজিকে গ্রেপ্তার করেছিল ইংরেজ সরকার ।
নেতাজি যাঁকে ভুলতে পারেননি, আমরা কিন্তু তাকে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে ফেলেছি।
(কোন কোন জায়গায় ওনার নাম গোপীনাথ বলেও দাবি করা হয়েছে। গোপীমোহন না গোপীনাথ কোনটা সঠিক নাম তা নিয়ে দ্বন্দ্ব কিন্তু এখনো আছে)