১২ ই জানুয়ারি
রবিব্রত ঘোষ
১২ই জানুয়ারি যে কেবলমাত্র বিবেকানন্দের জন্মদিন তাই নয়। আরো দুটি ঘটনা এই দিনটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
১২ই জানুয়ারি আরো একটি কারণে বিখ্যাত। মাস্টারদা সূর্যসেনের আত্ম বলিদান দিবস। নামটাই যথার্থ অন্ধকারে সূর্যরশ্মির সন্ধান দেওয়া। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়তে গিয়ে। একটার পর একটা সফল পরিকল্পনা করা। ইংরেজদের বিরুদ্ধে আঘাত হানা। এক ঝাঁক যুবক যুবতী কে উদ্দীপিত করা। তাদেরকে নিজের দলে টেনে আনা। এবং মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা আগে এক ঐতিহাসিক চিঠিতে উত্তরধিকারী হিসেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দায় হিসেবে আমাদের জন্য এক নতুন ভারতের স্বপ্নকে রেখে যাওয়া। সেই মহা ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ চিঠিটি আরো একবার দেখে নেওয়া যাক, কি ছিল তাতে।
ফাঁসির রজ্জু আমার মাথার ওপর ঝুলছে। মৃত্যু আমার দরজায় করাঘাত করছে। মন আমার অসীমের পানে ছুটে চলেছে। এইতো ‘সাধনার’ সময়। বন্ধুরূপে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার প্রস্তুতির এই তো সময়। চলে যাওয়া দিনগুলোকেও স্মরণ করার এই তো সময়।
কত মধুর তোমাদের সকলের স্মৃতি। প্রিয় ভাইবোনেরা আমার, প্রিয় দেশবাসী; বৈচিত্র্যহীন আমার জীবনের একঘেয়েমিকে ভেঙ্গে দাও তোমরা, উৎসাহ দাও আমাকে, উৎসাহে নেমে পড়ো। এই আনন্দময়, পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ মুহুর্তে আমি তোমাদের জন্য কি রেখে গেলাম? মাত্র একটি জিনিস, তা হলো আমার স্বপ্ন একটি সোনালি স্বপ্ন, স্বাধীন দেশের স্বপ্ন। কি শুভ মুহূর্ত ছিল সেটি, তখন আমি এই স্বপ্ন দেখেছিলাম। জীবনভর উৎসাহভরে ও অক্লান্তভাবে পাগলের মতো এই স্বপ্নের পেছনে ছুটেছি। কতটা সফল হতে পেরেছি, জানি না। কোথায় সেই অনুসরণ আজ থামিয়ে দিতে হচ্ছে আমাকে। লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগে মৃত্যুর হিমশীতল হাত তোমাদের স্পর্শ করলে তোমরা তোমাদের অনুসারী ও অনুগামীদের হাতে তার ভার তুলে দেবে এই অন্বেষণের আদর্শ, আজ যেমন আমি তোমাদের হাতে তুলে দিচ্ছি।
প্রিয় বন্ধুরা আমার, এগিয়ে এসো, এগিয়ে চলো, জীবন বিকাশের দিকে এগিয়ে চলো-কখনো পিছিয়ে থেকো না। বন্ধনের দিন শেষ হয়ে আসছে। ঐ দেখা যাচ্ছে। স্বাধীনতার নবারুণ। উঠে পড়ে লাগো। কখনও হতাশ হয়ো না। জয় আমাদের সুনিশ্চিত, জীবনের সাফল্য আমাদের অবধারিত।
১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিলের চট্টগ্রাম বিপ্লবের কথা কোনো দিন ভুলো না। জালালাবাদ, চন্দননগর ও ধলঘাটের সংগ্রামের কথা সবসময় স্পষ্টভাবে স্মরণ করো। দেশের স্বাধীনতার বেদিমূলে যেসব দেশপ্রেমিক তাদের জীবন কোরবানি দিয়েছেন, তাঁদের নাম রক্তাক্ষরে অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে লিখে রেখো। আমাদের সংগঠনে, আমাদের জীবনে যেন বিভেদ না আসে এই আমার একান্ত আবেদন তোমাদের কাছে। যাঁরা কারাগারের ভেতরে ও বাইরে রয়েছে তাদের সকলকে আমার আশীর্বাদ ও অভিনন্দন। বিদায় নিলাম তোমাদের কাছ থেকে।
মাস্টারদা সূর্য সেন
বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।
এটা কোন চিঠি নয়। এটা একটা কম্পাস। আমাদের অতীত, আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের উত্তরাধিকার, দায়িত্ব, কর্তব্য দিকনির্দেশ করার যন্ত্র।
১২ই জানুয়ারি আরো একটি কারণে বিখ্যাত। বিখ্যাত বিপ্লবী প্রদুৎ এর আত্ম বলিদান দিবস। একটু অপরিচিত কিন্তু এরাই একটা সময় মেদিনীপুরে ইংরেজদের মধ্যে কাঁপন ধরিয়ে দিতে পেরেছিলেন। ফাঁসির কয়েক ঘন্টা আগে তাকে জেলাশাসক জিজ্ঞাসা করেছিলেন তুমি প্রস্তুত তো? প্রদু্ৎ হাসতে হাসতে উত্তর দিয়েছিলেন আমি তো বস্তুত কিন্তু এবার আপনিও প্রস্তুত হন আপনাকেও মরতে হবে এটাই ঘটেছিল । প্রদু্ৎ এর উত্তরাধিকারীরা সেই জেলা শাসক কে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে পেরেছিল। পরিস্থিতি এমন একদিকে যায় যেখানে কোন ইংরেজ ই আর মেদিনীপুরে জেলা শাসকের দায়িত্ব নিতে রাজি হচ্ছিলেন না।
এই সব ঘটনারই আশ্চর্য সমাপতন হলো ১২ জানুয়ারি।