বিস্মৃত বিপ্লবী অনাথ বন্ধু
রবিব্রত ঘোষ
গত শতকের তিরিশের দশকের মেদিনীপুর শহর। তখন ভারতবর্ষে স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল সময়। আর বাংলায় বাজছে বিপ্লবের রণভেরী। পর পর দুজন জেলাশাসক নিহত হয়েছেন বিপ্লবীদের হাতে। এমন সময় জানা গেল টাউন ক্লাবের সাথে কলকাতার মোহামেডান স্পোর্টিং এর একটা প্রীতি ফুটবল ম্যাচ হবে। জেলাশাসক খোদ নিজেই অংশগ্রহণ করবেন মেদিনীপুর টাউন ক্লাবের হয়ে। খেলার দিন লোকে লোকারণ্য সবাই খেলা দেখতে উৎসুক। এমন সময় এগিয়ে এলো জেলা শাসকের গাড়ি। জেলাশাসক গাড়ি থেকে নেমে ঢুকে পড়লেন মাঠে। আর উনি ঢোকার সাথে সাথেই পশ্চিম দিকে গোলপোস্ট থেকে বেরিয়ে এসে মানুষের সাথে মিশে পজিশন নিলেন কয়েকজন গুপ্ত বিপ্লবীরা। মুহূর্তের অপেক্ষা, তারপরই চললো গুলি। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন জেলাশাসক বার্জ। একজন তার ওপর উপরে চড়ে বসলেন আর রিভলবার থেকে যতক্ষণ না শেষ হচ্ছে এক নাগাড়ে গুলি চালিয়ে গেলেন। এবার সম্বিত ফিরল ব্রিটিশ প্রশাসকদের, তারাও পাল্টা আক্রমণ করলেন। একজন ঘটনাস্থলেই তাদের গুলিতে নিহত হলেন। আরেকজন পরের দিন হসপিটালে প্রাণ ত্যাগ করলেন। গোটা ঘটনাটা টানটান নাটকীয়তায় মোড়া। কোন গল্প নয়, কোন সিনেমা নয়, এটাই সত্য, এটাই বাস্তব। অনাথ বন্ধু পাঁজা আর তার এক সঙ্গী মৃগেন্দ্রনাথ দত্ত মেদিনীপুরের জেলা
শাসককে হত্যা করেছিলেন ঠিক এভাবেই জনসমক্ষে।
এই ঘটনার কয়েক বছর আগে থেকেই মেদিনীপুর ছিল উত্তাল বিপ্লবীদের কর্মক্ষেত্র। একের পর এক অত্যাচারী জেলা শাসককে সরিয়ে দিয়েছে বিপ্লবীরা। অবশ্য তাদেরও অনেক প্রতিদান দিতে হয়েছে। অনেককেই প্রাণ বলিদান করতে হয়েছে ফাঁসির মঞ্চে। কাউকে কাউকে যেতে হয়েছে দ্বীপান্তরে। কেউ কেউ পেয়েছেন দীর্ঘ কারাবাসের রায়। আর অনেকেই অত্যাচারিত হয়েছেন। সহ্য করতে হয়েছে অকথ্য নির্যাতন। তবু তাদের দমানো যায়নি, টলানো যায়নি এক চুল।
প্রথম জেলাশাসক পেটি, তারপরের জেলা শাসক ডগলাস দুজনেই মারা গেলেন বিপ্লবীদের হাতে। একটা সময় এমন হলো ব্রিটিশরা নতুন কোন জেলা শাসককেই খুঁজে পাচ্ছিল না। প্রত্যেকেই প্রাণের ভয় পাচ্ছিলেন। এমন সময় পাওয়া গেল বার্জ কে। পুরো নাম বেঞ্জামিন ই জে বার্জ। ধুরন্ধর ও অসম্ভব বুদ্ধিমান। বিপ্লবীদের কর্মপদ্ধতি বুঝে রুটিন বলে কিছুই প্রায় রাখলেন না। কেউ যাতে তার গতিবিধি বুঝতে না পারে তাই তার যাত্রা পথ বদলানো হতো। আর তা অত্যন্ত গোপন রাখা হতো। জেলাশাসকের চেয়ারে আসীন হয়েই ঠিক করলেন মেদিনীপুর থেকে বিপ্লবী আন্দোলনকে ধ্বংস করবেন। শায়েস্তা করতে তিনি উঠেপড়ে লাগলেন। শহরে চালু হলো কার্ড নীতি। তিন রকমের কার্ড। স্কুল কর্তৃপক্ষ বাড়ি ও এলাকার প্রত্যেকটি মানুষের খবর নিয়ে তাদের গতিবিধির উপরে গোপন নজরদারি চালিয়ে প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা কার্ড তৈরি করা হলো। সেই মতো কার্ড বিতরণও করা হলো। এই কার্ড নিয়েই পথে বেরোতে হবে না হলে কিন্তু পুলিশে ধরবে। এই ফরমান ও জারি হয়ে গেল। সাদা কার্ডের অর্থ ছিল সন্দেহ মুক্ত। নীল অর্থাৎ সন্দেহজনক। আর লাল কার্ড মানে সাংঘাতিক কিছু। লাল কার্ড ধারীদের প্রায়ই পুলিশ জেরা করার জন্য উঠিয়ে নিয়ে যেত। তার মানে পুলিশের অকথ্য অত্যাচারের সম্মুখীন হওয়া। বার্জের আগের জেলাশাসক ডগলাস কে হত্যার জন্য বিপ্লবী প্রদ্যূৎকে ফাঁসির রায় দেওয়া হয়। আর অভিযোগ ছিল বার্জ তাকে অত্যাচার করেন। যা অনৈতিক শুধু নয়, চরমতম নিন্দনীয় ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। তবু ফাঁসির দিন সকালবেলা বার্জ প্রদ্যূতকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন প্রদ্যুৎ আর ইউ রেডি। ওয়ান মিনিট প্লিজ মিস্টার বার্জ। প্রদ্যূতের জবাব ছিল। প্রদ্যূৎ উত্তর দিয়েছিলেন উই আর ডিটারমাইন্ড মিস্টার বার্জ নো টু এনি ইউরোপিয়ান টু রিমাইন অ্যাট মেদিনীপুর। ইয়েস দ্যা নেক্সট টার্ন গেট ইওর সেলফ রেডি।
এরপরই বার্জের নিরাপত্তা আরো বাড়ানো হলো অফিস বাড়ি সব ঘিরে দেওয়া হলো সশস্ত্র নিরাপত্তা রক্ষীদের দিয়ে। বাড়িতে অফিসে অপরিচিত কারোর সঙ্গে দেখা করাই বন্ধ করেদিলেন জেলাশাসক।
বাংলার বিপ্লবীদের দমানো গেলনা। বরং সিদ্ধান্ত হয়ে গেল বার্জ কে সরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠলো এই সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়িত করবে কারা? অনেক খোঁজার পর শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া গেল অনাথ বন্ধু পাঁজা আর মৃগেন্দ্রনাথ দত্তকে। বছর কুড়ির অনাথ বন্ধুর মেদিনীপুর জেলার সবং এর জলবিন্দু গ্রামে জন্ম। বাবা সুরেন্দ্রনাথ অনাথ বন্ধুর তিন বছর বয়সেই মারা যান। মা কুমুদিনী দেবী ও বড় ভাই তাকে প্রতিপালন করেন। গ্রামে ভুবন পালের পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করার পর মায়ের সাথে মেদিনীপুর শহরে চলে আসেন। মেদিনীপুর শহরের সুজাগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু আর্থিক কারণে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স এর সঙ্গে তার যোগাযোগ শুরু হয়। এই সময় তখন বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স মানেই ব্রিটিশ মুক্ত স্বাধীন ভারত বর্ষের স্বপ্ন।
বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স এর বিপ্লবী ভাবধারায় নিজেকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ফেললেন অনাথ বন্ধু। ঘরে টাকার অভাব, আবার বাইরে বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স এর ও টাকার দরকার। এই সময় খড়্গপুরে তাদের জমিতে যে ধান চাষ করা হতো তাই বিক্রি করেই তাদের সংসার চলতো। একবার ধান বিক্রি বাবদ পাওয়া বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সে জমা দিলেন অনাথ বন্ধু। আর মাকে বললেন রাস্তায় পকেটমার হয়ে গিয়েছে। বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স এর সহযোগিতায় প্রথমে মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। এখান থেকেই রিভলবার চালানো শেখার জন্য কলকাতায় যান। আর কলকাতা থেকে পাঁচটি রিভলবার নিয়ে ফেরত আসেন।
এই রিভলবার দিয়েই ১৯৩০ সালের ২রা সেপ্টেম্বর হত্যা করেন বার্জকে। এখানে উল্লেখ করার মত একটা ঘটনা হলো বার্জ মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর, আনন্দের সঙ্গে অনাথ বন্ধু বার্জের শরীরে চেপে বসেন। আর যতক্ষণ না রিভলবারের গুলি শেষ হচ্ছে ততক্ষণ একটার পর একটা গুলি চালিয়ে গিয়েছিলেন। এই ভাবে আনন্দের সঙ্গে গুলি চালানোয় মেতে থাকার জন্য, ব্রিটিশ পুলিশ ও যে তাকে গুলির নিশানায় এনে ফেলেছেন অনাথ বন্ধু বুঝতেই পারেননি বুঝতেই পারেননি। ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতেই তিনি নিহত হন সেখানেই।
অনাথ বন্ধু প্রকৃত অর্থেই বিস্মত বিপ্লবী আমরা কেউই তার নাম মনে রাখিনি। তার নামে কোন রাস্তাও নেই জন্মদিন ও সেভাবে পালন করা হয় না। কেবলমাত্র অনাথ বন্ধুর স্মৃতিতে তার গ্রামের কাছেই অনাথ বন্ধু স্মৃতি বালিকা বিদ্যালয় হয়েছিল এর বেশি কিছু আজও করে ওঠা হয়নি॥