ব্রিটিশ শাসিত ভারতে উনবিংশ শতকের ছয়ের দশকে ভারতের পূর্ব প্রান্তে আবির্ভাব হয়েছিলেন এক কন্যার-কাদম্বিনী বসু। ১৮৬১ সালের ১৮ জুলাই ভাগলপুরে জন্ম কাদম্বিনীর। কাদম্বিনী বসু গঙ্গোপাধ্যায়— ‘কাদম্বিনীর’ পিতা ব্রজকিশোর বাবু ভাগলপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের সংস্কারক এবং ১৮৬৩ সালে তিনিই নারী অধিকারের দাবিতে ভাগলপুরে মহিলা সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। তিনি মেয়েকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
কাদম্বিনীর শিক্ষা শুরু হয় ঢাকার ইডেন মহিলা বিদ্যালয়ে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে কাদম্বিনী ভাগলপুর থেকে কলকাতায় আসেন এবং ভর্তি হন হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়ে। এই বিদ্যালয় পরে বেথুন স্কুল ও কলেজে পরিণত হয়। ১৮৭৭ সালে ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং তার সহপাঠিনী সরলা দাস দ্বিতীয় হন। সেই সময় অক্সফোর্ড কেম্ব্রিজের নিয়মানুযায়ী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও মেয়েদের এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বসার অধিকার ছিল না। বেথুন স্কুলের শিক্ষক দ্বারকানাথের অনেক প্রচেষ্টায় শেষপর্যন্ত যোগ্যতা প্রমাণের শর্ত সাপেক্ষে উপাচার্য তাদের এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বসার অনুমতি দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা অধ্যাপকবৃন্দ এদের ইংরেজী বাংলা ইতিহাস গণিত বিষয়ের পরীক্ষা নেন। বলা বাহুল্য সেই যোগ্যতার পরীক্ষায় উভয়েই ঊত্তীর্ণ হন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বসার অনুমতি পান। কাদম্বিনী এন্ট্রান্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে ঊত্তীর্ণ হন। মাত্র ১ নম্বরের জন্য প্র্থম বিভাগ পান না।
১৮৮০ সালে বেথুন কলেজের একমাত্র ছাত্রী কাদম্বিনী এফ এ (ফার্স্ট আর্টস) ১৮৮৩ সালে বেথুন কলেজের ছাত্রী হিসেবে কাদম্বিনী এবং চন্দ্রমুখী বসু কৃতিত্বের সংগে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। এরাই হলেন ভারতে সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে প্রথম মহিলা স্নাতক।
এইবার কাদম্বিনীর নতুন এবং কঠিন সংগ্রাম। সেই সময়ের নিয়মে স্নাতক হলেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনা বেতনে মেডিক্যাল পড়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু কোন মহিলার মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সুযোগ ছিল না। কাদম্বিনীর ক্ষেত্রে শেষপর্যন্ত কলকাতা মেডিক্যাল কাউন্সিল ঐ নিয়ম শিথিল করে কাদম্বিনীকে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির অনুমতি দেন। জনৈক অধ্যাপকের বারবার তার প্রতি বিরূপতার কারণে এম বি পাশ করা হয় না। শেষপর্যন্ত কলেজের অধ্যক্ষের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাকে GMCB গ্রাজুয়েট অফ মেডিক্যাল কলেজ অফ বেঙ্গল উপাধি দেওয়া হয় যা তাকে চিকিৎসা করার অধিকার দিয়েছিল। এবং অল্প দিনের মধ্যেই মহিলা ডাক্তার হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন।
কাদম্বিনী মেডিক্যাল কলেজে নাম রেজিষ্ট্রেশনের আগেই ২৩ বছর বয়সে তার চেয়ে ৩৯ বছরের বড় বেথুন স্কুলের শিক্ষক ও তার পথপ্রদর্শক দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে বিয়ে করেন। বাল্যে পিতা এবং পরে স্বামীর উৎসাহ এবং অকুন্ঠ সহমর্মিতা কাদম্বিনীর কাছে তৎকালীন গোঁড়া পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কুৎসা প্রতিহিংসা আক্রমণ প্রতিহত করে এগিয়ে যাওয়া ও সাফল্য অর্জনে সহায়ক হয়েছে।
চিকিৎসক হিসেবে সাফল্য পেলেও কাদম্বিনী বুঝেছিলেন মানুষের মনে ভ্রান্তি দূর করে বিশ্বাস অর্জন করতে হলে তাকে বিলেতি ডিগ্রি অর্জন করতে হবেই। তাই স্বামীর উৎসাহ প্রেরণা ও সহায়তায় এক বছর বয়সের শিশু পুত্র সহ পাঁচটি ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের স্বামী ও সৎ কন্যা বিধুমুখীর হেফাজতে রেখে ২৬ ফেব্রুয়ারী ১৮৯৩ সন্ধ্যায় লন্ডন গামী এক মহিলার সহকারী হিসেবে জাহাজে রওনা দিলেন লন্ডনের উদ্দেশ্যে। লন্ডনে পৌঁছনোর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিভিন্ন কলেজে আবেদনপত্র জমা দেন এবং ক্লাস করতে শুরু করেন। সেই সময় লন্ডনের কলেজে তিনি বিলেতি পোষাক স্কার্ট ব্লাউজ এর পরিবর্তে ভারতীয় পোষাক শাড়ি ও ফুলহাতা ব্লাউজ পরে ক্লাস করতেন। সেই সময় এটা কত কঠিন কাজ ছিল সেটা এখন উপলব্ধির বাইরে। বিশেষ করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে তার তিক্ত অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে।
অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তিনটি উপাধি লাভ করেন। লাইসেনশিয়েট অফ দি রয়াল কলেজ অফ ফিজিসিয়ানস, এডিনবার্গ (এল,আর,সি,পি)। লাইসেনশিয়েট অফ দি রয়াল কলেজ অফ সার্জেনস; গ্লাসগো (এল,আর,সি,এস) এবং লাইসেনশিয়েট অফ দি ফ্যাকাল্টি অফ ফিজিশিয়ানস, ডাবলিন (এল,এফ,পি,এস)। এখন হলেন তিনি বিলেতি ডিগ্রিধারী প্রথম ভারতীয় মহিলা ডাক্তার। এরপর ডাফরিন হাসপাতালে ১৮৮৪ সালে তাকে দেওয়া হয় ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুল (এন,আর,এস মেডিকেল কলেজ) প্রফেসর অফ গায়নোকলজি এন্ড অবস্ট্রেট্রিটকস (মিড ওয়াইফারি)-র পদ। কর্তৃপক্ষ আর তাঁকে উপেক্ষা করতে পারলেন না। তিনি হলেন চিকিৎসা বিদ্যায় প্রথম ভারতীয় অধ্যাপিকা।