সুনন্দর ঠেলাগাড়ি
কৌশিক চট্টোপাধ্যায়
ভোর পাঁচটার আগেই বিছানা ছেড়ে উঠতে হয় সুনন্দকে। তার বন্ধুরা যখন স্কুলের রাস্তা ধরে তখন তাকে ছুটতে হয় বাজারে নানারকম মালপত্র কেনার জন্য। টাটকা সব্জিও কিনতে হয় আর চিকেনও কিনতে হয়। সব দরদাম করে নিতে হয়। আচমকা বাবা মারা যাওয়ার পর সুনন্দর জীবনটাও পাল্টে গেছে অনেকখানি। সে বুঝে গেছে মৌখিক সহানুভূতির কোনো দাম নেই। রোজগার করতে হবে সৎপথে। তাদের পাড়ার খোঁড়া নন্টে বা হাতকাটা পঞ্চাদের মতো নয়। বাবা মারা যাবার পর ওরা তাকে আলাদা করে ডেকেছিল। দুজনেই ওদের দলে যোগ দিতে বলেছিল। কিভাবে অতি সহজেই প্রচুর টাকা কামানো যায় তার নানারকম পদ্ধতি বলেছিল। এমন সময় সুনন্দর মতো কিশোরের মুন্ডু ঘুরে যাওয়া অতি সাধারণ ব্যাপার ছিল কিন্ত ওদের পাড়ায় রমেনকাকু এসে সুনন্দর পাশে দাঁড়ান। রমেন কাকুকে নন্টে, পঞ্চা সবাই ভয় কর। লোকটার টাকাপয়সা কম কিন্ত এলাকায় সবাই শ্রদ্ধা করে। আশেপাশের ছেলেমেয়েদের মাঠে নিয়ে এসে নানারকম খেলা শেখায়, নাটক শেখায়। ছোটরা রমেনকাকু বলতে অজ্ঞান। তা রমেনকাকুই সুনন্দকে এই ব্যবসার বুদ্ধিটা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে সুনন্দ। মাথা উঁচু করে বাঁচতে হবে। পৃথিবীটা বড়ই সুন্দর। কিন্তু কিছু মানুষ তাকে খারাপ করতে চায়। তোমাকে বেছে নিতে হবে পথ। কষ্ট করতে হবে কিন্তু আনন্দ পাবে। আর সময় পেলেই মাঠে আসবে। দেখবে মন ভাল হয়ে যাবে।”
সেই থেকে সুনন্দর জীবন অনেক পাল্টে গেছে।
সুনন্দ অনেক ভেবেচিন্তে খাবারের ঠেলা দিয়েছে। ওর মা রান্নার দিকটা সামাল দেয়। ও বাজার থেকে কেনাকাটা করে নিয়ে আসে। তারপর মায়ের রান্না করা খাবার বিক্রি করে। মোটামুটি যা বিক্রি হয় তাতে ওদের চলে যায়। কিন্ত জীবন সরলরেখায় চলে না। সুনন্দ যখন একটু একটু করে পায়ের তলায় জমি ফিরে পাচ্ছে তখনই হঠাৎ প্রশাসন থেকে ওদের মতো হকারদের ঠেলা সরিয়ে দেওয়া হলো। রাতারাতি বাঁধা খদ্দেরদের হারিয়ে অকূল পাথারে পড়লো মা বেটাতে। কিন্তু পরীক্ষার বুঝি আরো কিছু বাকি ছিল। মাত্র তিন দিনের জ্বরে সুনন্দর মা পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেল। সুনন্দর জীবন যেন খানখান হয়ে গেল। রমেন কাকু এই সময় এসে বুক দিয়ে আড়াল করলেন সুনন্দকে। নতুন করে বাঁচতে শেখালেন। অনেক গল্প বলতেন। সেসব জীবন থেকে নেওয়া সত্য কাহিনী। তারপর সুনন্দর খাবারের দোকান শুরু হলো এক গলিপথে। এতদিনে সে নিজেই রান্নাবান্না শিখে গেছে। একা হাতে শুরু করলো। খুব কম কম করে সব বানাতো কিন্ত সব শেষ হয়ে যেত। ওই গলিতে বেশ কয়েকজন ছাত্র ছাত্রীদের মেস। ওরা সুনন্দর কাছে খেত। সস্তায় ভালো খাবার পেয়ে ওরা রোজ আসতো। ধীরে ধীরে লোকমুখে খবর পেয়ে ভীড় বাড়তে লাগল। সুনন্দ দুজন হেল্পার রাখলো। এদিকে ছাত্র ছাত্রীদের করা ফুড ব্লগিংয়ের দৌলতে দুই বছরের মধ্যেই সুনন্দ মোটামুটি সেলিব্রিটি হয়ে গেল।
এখন সুনন্দর আর্থিক স্বচ্ছলতা যথেষ্ট। কিন্ত খারাপ দিনগুলো সে ভুলে যায়নি। নিজের এলাকার দুঃস্থ পড়ুয়াদের সে অকাতরে সাহায্য করে। সবচেয়ে মজার কথা নন্টে, পঞ্চারা বরং সুনন্দর জন্য গর্ব বোধ করে। পঞ্চা সেদিন সুনন্দকে বললো, “তোকে একদিন আমাদের লাইনে আসতে বলেছিলাম কিন্ত আজ আমি নিজেই স্বীকার করছি আমি ভুল করেছিলাম। তোর রাস্তাই ঠিক। তুই এত কাণ্ডের মধ্যেও বিকেলবেলা মাঠে আসিস। আমার ছেলেটাকেও মাঠে নিয়ে যা। ভালো সংসর্গে রাখ। আমার সঙ্গে থাকলে উচ্ছন্নে যাবে।”
সুনন্দ বললো, “এই মাঠ আর মাঠের দাদারা, কাকুরা আমাকে আগলে রেখেছে। আমাকে অনাথ মনে করতে দেয়নি। এরা আসলে এক আদর্শ বোধ গেঁথে দিয়েছে আমার মধ্যে। কাকু তোমার ছেলেকে পাঠিয়ে দিও। মাঠে আরেকটা ফুল ফুটবে।”
সুনন্দর ঠেলাগাড়ি আজও জীবনের পথ ঠেলে চলেছে। শুধু নিজের জন্য বাঁচা নয় অন্যকেও বাঁচতে শেখানোর মহামন্ত্র শিখিয়ে চলেছে এই ঠেলাগাড়ি।