দাদু ও সাধু
প্রভাত সরকার
দাদু বাজার যাবার সময় সাধু ঠিক দাদুর পেছন ধরবে। যেন অপেক্ষা করেই বসে থাকে।
শীতকালে সাধুর মায়ের তিনটে বাচ্চা হয়েছিল - লাল, কালো আর সাদা। তখন ভালো করে চোখ ফোটেনি। বিল্টু লালটার নাম দিয়েছিল লালু, কালোটার কালু আর সাদাটার সাধু। লালু আর কালু শেষ পর্যন্ত বাঁচেনি ঠান্ডাতে। তবে বিল্টুর যত্নে সাধু বেঁচে গিয়েছিল। সেই থেকে সাধু ওদের গেটের পাশেই বসে থাকে সারাক্ষণ, যেন পাহারাদার। বাড়ি থেকে কেউ বের হলেই খানিকটা এগিয়ে দিয়ে এসে আবার গেটের পাশে বসে।
বাড়ির সামনের ল্যাম্পপোস্টটার আড়ালে দুটো আস্ত ইঁট উল্টোকরে পেতে দিয়ে খাবার জায়গা করে দিয়েছে বিল্টু। সাধুর আবার নিরামিষ পছন্দ নয়। মাছ - মাংসর গন্ধ না থাকলে তার ভাত রোচে না। বিল্টুর বাবা মাংসের দোকানে বলে দিয়েছে। দাদু মাংসের দোকানে গেলেই খানিকটা মাংসের ছাঁট আলাদা করে দিয়ে দেয় দোকানি। দাদুর হাতে বাজারের থলিটা দেখলেই সাধু পিছু নেয়। বাজারের বাইরে গাছের নীচে বসে দাদুর জন্য অপেক্ষা করে। তারপর একসঙ্গেই বাড়ি ফেরে।
বিল্টু হাসে, “রবিবার সাধু লেজটা যেন বেশি নাড়ে দাদুভাই তোমাকে দেখে!”
দাদুও হাসে, “ও জানে যে রবিবারে মাংস আনতে যাব, সেইজন্য তেল মারে আমাকে।”
সেবার সাধুর গায়ে ঘা হয়েছিল। তখনই বিল্টু বুঝতে পেরেছিল দাদু কত ভালোবাসে সাধুকে। সারা শহর ঘুরে সাধুর জন্য ওষুধ আর স্প্রে মেশিন খুঁজে নিয়ে এসেছিল দাদু। গেটের পাশে সাধুকে শুয়ে থাকলেই দাদু ওষুধ স্প্রে করে দিত। পাঁচ - ছ দিনেই সাধু ভালো হয়ে গেলে দাদুর সে কী আনন্দ ।
বিল্টুর ঠাম্মা অবশ্য বলেছিল, “বুড়ো বয়সে কুকুর নিয়ে যত আদিখ্যেতা, ছিঃ !”
বিল্টুর মা জিজ্ঞেস করেছিল, “কী ওষুধ দিয়েছিলেন বাবা? কত দাম?”
দাদু দায়সারা উত্তর দিয়েছিল, “দাম বেশি না বউমা, শ খানেক হবে, মনে পড়ছে না ঠিক। তবে নিজের চোখেই দেখলে তো আমার ডাক্তারিটা?”
ঠাম্মা দূর থেকে ফোড়ন কেটেছিল, “ওকালতি আর ডাক্তারি একসঙ্গে কোনোদিন শুনিনি বাপু! সারা জীবন ওকালতি করে এখন ডাক্তারি, মা গো, কী আর বলব!”
সাধু আবার আগের মতই দাদুর সংগে বাজার যায়। সেদিন বাজার থেকে ফিরে সদ্য কেনা চটি জোড়া বারান্দার বাইরেই খুলে রেখেছিল দাদু। একটা ভিখারি ভিক্ষা চাওয়ার জন্য গেট খুলে ঢুকে নিজের পুরোনো প্লাস্টিকের চটিজোড়া খুলে রেখে দাদুর নতুন চটিগুলো পরে ভিক্ষা না নিয়ে চুপিচুপি পালাচ্ছিল। গেটের পাশেই শুয়েছিল সাধু। দাদুর চটির শব্দটাও ওর চেনা। কানে চেনা চটির শব্দটা যেতেই চোখ খুলে দেখে - ভিখারিটা দাদুর চটি পায়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে ঘেউ ঘেউ করে ওকে তাড়া করেছিল সাধু। লোকটা তো সাধুর ভয়ে দাদুর চটিজোড়া ফেলে দিয়ে দে ছুট।
বাড়ির সবাই বেরিয়ে এসে সাধুর কাণ্ড দেখে হেসে অস্থির। বিল্টু চেপে ধরল দাদুকে, “তুমি তো বলেছিলে সাধুর জন্য একশ টাকার ওষুধ কিনেছিলে। দেখ, সাধু তোমার তিনশ টাকার চটি বাঁচিয়ে দিল।”
সবাই ঘরে ঢুকে পড়তেই মিটিমিটি হেসে আশেপাশে কেউ নেই দেখে দাদু ফিসফিস করে বলল, “নারে দাদুভাই সাধুর জন্য অনেক টাকারই ওষুধ কিনেছিলাম। ওকে আমার পাতের ভাত দেওয়ার সময় সবার অলক্ষ্যে ওষুধ মিশিয়ে দিয়ে আসতাম। নাহলে কী আর এত তাড়াতাড়ি সেরে উঠত।”
বিল্টু শুনে অবাক, “কাউকে বলনি কেন দাদুভাই?”
দাদু ইশারা করল, “চুপ চুপ, তোর ঠাম্মা শুনতে পেলেই চেঁঁচিয়ে পাড়া মাথায় তুলবে। ওই দেখ ঠাম্মা আসছে এদিকে।”
বিল্টু জোরে বল, “জীব সেবাই”
দাদুও বিল্টুর সংগে গলা মেলাল, “শিব সেবা”।
ঠাম্মা এগিয়ে এল, “এই তোরা কী বলছিলিরে ফিসফিস করে? নিশ্চয় আমার নামে বলছিল তোর দাদু। ওর তো আর কোনো কাজকম্ম নেই ! “
সবাই চুপ করে আছে দেখে আঁচল কোমরে জড়িয়ে যাবার আগে ঠাম্মা বলে গেল, “আমি কানে হয়ত কম শুনতে পারি, কিন্তু কালা নই, বুঝলি? মনে রাখিস কথাটা।”