বদনদার বদনসিব

পুলক কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

মাঝরাত্তিতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেতে দেখি বদনদা নেই। ঘরে আলো জ্বলছে, আমার পাশেই অধীর ঘুমচ্ছে দিব্যি নাক ডাকিয়ে, অথচ ওপাশের তক্তাপোষটা ফাঁকা।

কী ব্যাপার! কেমন যেন একটা খটকা লাগল। হ্যাঁ, বেশ মনে আছে, তিনজনে একসঙ্গে শুতে এসেছিলাম ঘরে। চারিদিকে ভাল করে মশারি—টশারি গুঁজে আলো নিভিয়ে নিজের বিছানায় শুয়েছিল বদনদা। তাহলে। মাঝরাত্তিরে গেল কোথায় মানুষটা?

দু’বার ‘বদনদা’ ‘বদনদা’ বলে ডাকতেও কোন সাড়াশব্দ নেই। কী ব্যাপার, তাহলে কি ছাদে গেল। না, ব্যাপারটা যেন কীরকম গোলমেলে ঠেকছে।

আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নেমে বাইরে গেলাম। দরজা ভেজানো ছিল। ঘুটঘুটে অন্ধকার। হিম পড়ছে, কনকনে ঠান্ডায় মস্ত ছাদে দাঁড়িয়ে ছমছম করছে গা। এদিক—ওদিক তাকিয়ে সরু গলায় ডাকলাম—বদনদা! বদনদা...।

এতবড় ছাদের একেবারে পশ্চিমকোণ থেকে আওয়াজ ভেসে এল—কেন রে? ঘুম ভেঙে গেছে বুঝি? যাকগে। এতক্ষণে মনে পড়ল, সন্ধে থেকেই বদনটা বলছিল বটে—আজ রাতে উল্কাবৃষ্টি। মহাজাগতিক ব্যাপার। এমন দুর্লভ দৃশ্য না দেখে থাকা যায়।

তাই বলে এই ঠান্ডায় মাঝরাত্তিরে খোলা ছাদে বসে আকাশের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা। উঃ, ভাবা যায়! নেহাৎ বদনদার পক্ষেই সম্ভব। মাথা পর্যন্ত চাদরে ঢাকা, হাতে একটা দুরবীন। আমাকে কাছে পেয়ে একেবারে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল—এ সুযোগ ছাড়িসনা। ঘুম তো সারাজীবনের জন্যে রইলই, তুইও বসে যা আমার সঙ্গে।

  আমি বিরক্তমুখে জিজ্ঞেস করি—ক’টা উল্কা পড়তে দেখলে বদনদা?

—অগুণতি! অগুণতি! এই পড়ছে তো ওই পড়ছে। উঃ, চোখের পাতা ফেলার মতো। একটু আগেই পড়ল রেললাইনের ঠিক ওপরটায়, পড়েই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। আমি জায়গাগুলো মোটামুটি বুঝে রেখেছি, কাল সকাল হলেই গিয়ে দেখে আসব।

আমরা যে এতক্ষণ কথাবার্তা বলছি, কই একটা আলোর ছটাও তো দেখলাম না আকাশে। বদনদা খপ করে আমার হাতটা ধরে বলল—চলে যাস না, এক্ষুনি দেখা যাবে। আমার এই পাশটাই বস, এ দৃশ্য না দেখলে আফশোস করবি কিন্তু।

দূর! যত্তসব উদ্ভুটে কাণ্ড! আমি কোথায় মানুষটাকে ঘরের মধ্যে না দেখতে পেয়ে খোঁজাখুঁজি করছি, এখন বলে কী না এই ঠান্ডায় ওর পাশে বসে মহাজাগতিক কান্ডকারখানা দেখতে হবে! এসব ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্রও আগ্রহ নেই।

প্রায়ই বদনদা বলে—ওরে, মানুষের জানার শেষ নেই। শুনে অধীর ফিচলেমি করে—দেখো, জানতে জানতে যেন জানোয়ার হয়ে যেও না। বদনদা হো হো করে হেসে ওঠে—খাসা মিলিয়েছিস যাহোক। আমরা জানি, বদনদার ভাষণের ঠ্যালায় কান ঝাঁ—ঝাঁ। অগত্যা, কথার ওপরে কথা চাপালেই তর্কাতর্কি, হাতাহাতি। কতবার তা হয়েওছে। আমার চেয়ে পাক্কা চারবছর এগারো মাস তিনদিনের বড় বদনদা, অধীরের থেকে আর একটু বেশি। এসব হিসেবনিকেশ বদনদা নিজেই করেছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। যখনই দেখি কোনও একটা ব্যাপারে তার বেশি মনোযোগ তখনই বুঝতে হবে নির্ঘাৎ কোনও নতুন আইডিয়া ওর মাথায় গুঁতো মারছে। তার মানে আমাদের আবার নতুন কোনও ফ্যাসাদ এল বলে।

মেসের দোতলায় একটা ঘরেই আমরা তিনজন থাকি। অনেক খুঁজে—পেতে কম খরচের এই মেসটা জোগাড় করেছিলাম। অধীর টিউশনি করে, আমি নাইট—কলেজে পড়ি, আর বদনদা যে কী করে তা কেউ জানে না। মুখে তো বলে অর্ডার সাপ্লাইয়ের ব্যবসা, আমরা অবশ্য এ—ব্যাপারে আদৌ মাথা ঘামাই না। মড়া পোড়ানো থেকে শুরু করে চোর ঠ্যাঙানো, পুজোর চাঁদা তোলা, দেওয়ালে পোস্টার সাঁটা—এরকম অনেক বিষয়েই মানুষটা করিৎকর্মা। সবেতই সে আছে।

আমি মাঝে মাঝে একটু উস্কে দিই—তুমি মাইরি একটি ভার্সেটাইল জিনিয়াস। কত কী জানো! চারিদিকে কত নামডাক তোমার।

যাক, স্বীকার করিস তাহলে। বেশ গর্ববোধ করে বদনদা, ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে সবকটা দাঁতই যেন বেরিয়ে আসতে চায় আমাদের কথা শুনে—জানতে তো হবেই। শেখার কি শেষ আছে রে? আসল কথাটা হচ্ছে, জানার আগ্রহ, তাহলে শিখে ফেলতে কতক্ষণ।

তাই বলে কনকনে ঠান্ডায় মাঝরাত্তিরে ছাদে বসে উল্কা পড়া দেখা! সে কী উচ্ছ্বাস বদনদার। পরের দিন ফলাও করে শোনাল সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা উঃ, কী দুর্লভ দৃশ্য! নিজের চোখে না দেখলে তোরা বিশ্বাসই করবি না। মহাজাগতিক কান্ডকারখানা দেখতে দেখতে আমি একবোরে থ’। লক্ষ—লক্ষ, কোটি—কোটি আগুনের গোলা একসঙ্গে নেমে আসছে মাটিতে। দাউ দাউ জ্বলছে। যেন মনে হচ্ছে, আকাশের মাঝে এক ভয়ংকর যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। আমার মতো এমন সাহসী মানুষেরও বুক তখন ভয়ে কাঁপছিল।

অধীর বরাবরই ঠোঁটকাটা। এখন অবশ্য সামনে কিছু বলল না, কিন্তু বদনদা বাইরে যেতেই একেবারে লাফিয়ে উঠল—স্রেফ গুল! আমাদেরকে কি এতই বোকা ভাবছে নাকি রে? পুরোপুরি জল মিশিয়ে দিল। আজকাল বদনদা বোধহয় নেশা—টেশাও করছে।

আমি জানি, বদনদার নেশা বলতে কিছু নেই। কেবল মাথায় ভূত—টুত চাপলেই হয় মুশকিল। যে জিনিসটা ধরবে সেটার শেষ না দেখে ছাড়বে না।

তা না হয় হল, কিন্তু তাই বলে কে ওকে মাথার দিব্যি দিয়েছিল যে এইভাবে জনগণের সেবা করতে হবে। ক’দিন ধরেই লক্ষ্য করছিলাম, অন্য সব কাজকর্ম শিকেয় তুলে বদনদা শুধু কী সব বইপত্তর পড়ছে আর খাতায় লিখছে। উঁকিঝুঁকি মেরে দেখি কবিরাজি দাওয়াই, মডার্ন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা, জল—চিকিৎসা, চুম্বক—চিকিৎসা। ও বাব্বা! বদনদা এবার ডাক্তারিও করবে নাকি?

—সেবা পরমধর্ম, বুঝলি না! পরের কষ্ট দেখে থাকতে পারি না রে!

অধীর ফিসফিস করে বলল—অন্য একটা মেস—টেস পেলে আমি আগে পালাব। এবার নির্ঘাৎ আমাদের কপালেও দুর্গতি আছে।

কোন কথায় কান না দিয়ে বদনদা নিজের কাজ নিয়েও ব্যস্ত। গুচ্ছের পয়সা খরচ করে নানান ওষুধপত্তর কিনে আনল, কত গাছগাছড়া আর শেকড়বাকড় এনে জড়ো করল ঘরে, ডাইরিতে পাতার পর পাতা ভরিয়ে ফেলল রাত জেগে লিখে লিখে। আমাদের মনে কৌতূহলের শেষ নেই। এর মধ্যে জ্বর—সর্দির মতো ছোটখাটো অসুখের ওষুধ দেওয়াও শুরু করে দিয়েছে। কখনও কবিরাজি, কখনও বা হোমিওপ্যাথি। একেবারেই বিনাপয়সায়। কী অদম্য আগ্রহ আর উৎসাহ বদনদার। সেদিন আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল—দেখে নিস, আমি একদিন বিপ্লব আনব। হয়তো কোনও কঠিন রোগের ওষুধও আবিষ্কার করে ফেলব। সেদিন আমার জন্যেই তোদেরও নাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়বে, কথাটা মিলিয়ে নিস্।

আমি গলার স্বর একটু গম্ভীর করে বললাম—এ একেবারে ধ্রুব সত্যি কথা! আমি তো দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি, অদূর ভবিষ্যতে জনগণই আমাদের তিনজনের শহিদবেদি পাশাপাশি তৈরি করে দেবে।

—এই, তুই কিন্তু ঠাট্টা করছিস। তোরা বড্ড বেরসিক। কোনও কিছুই সিরিয়াসলি নিতে শিখলি না।

যেন একটু অভিমান হল বদনদার। অধীর অবশ্য এসবের তোয়াক্কা করে না, আমাকে আড়লে পইপই করে সাবধান করে দিয়েছে—খবরদার, কোনও দিন যেন ভুলেও ওইসব পাঁচন—টাচন মুখে দিস না, নির্ঘাৎ মারা পড়বি।

—গাছগাছড়া, শেকড়বাকড়ের যে কী গুণ তা শাস্ত্রেও লেখা আছে, তোরা তো কিছুই পড়লি না, জানার আগ্রহও নেই। বদনদার এরকম আক্ষেপ শুনতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। কিন্তু ভাবতে পারিনি যে মেসের মধ্যে এমন একটা ধুন্ধুমার কান্ড ঘটে যাবে ক’দিন পরেই।

এর বিন্দু—বিসর্গ আগে থেকে একটু টের পাইনি। আমি না, অধীরও না। 

পাড়ার ক্লাবে নিয়মিত যাতায়াত বদনদার। ক্যারাম খেলে, তাস খেলে। ওদের পার্টনার ব্রজগোপালের নাকি ক’দিন থেকেই খুব জ্বর, বুকে সর্দিও বসেছে। কাশছে অহরহঃ। কথাটা কানে যাওয়া—মাত্র বদনটা ছুটেছে তার বাড়িতে।

সেদিন সন্ধের সময় ক্লাবের কয়েকজন হঠাৎ একেবারে হুড়মুড় করে আমাদের ঘরে ঢুকে ঝাঁঝিয়ে উঠল—কোথায় গেল বদনা? ব্যাটা ডাক্তার হয়েছে! মানুষ মারার ফাঁদ পেতেছে।

কী ব্যাপার? বদনদা ঘরে নেই, কোথায় গিয়েছে কিছু বলেও যায় নি। আমি আর অধীর মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি। ঘটনাটা যে কী ঘটেছে সেটাই তো ঠিক বুঝছিনা।

ওদের একজন বলল—বেচারি ব্রজ সর্দিকাশিতে ভুগছিল, সেই সঙ্গে জ্বর আর মাথার যন্ত্রণা। বেটা বদন গিয়ে কী একটা পাঁচন ওর গলায় জোর করে ঢেলে দিয়ে এসেছে। ব্যস, তারপর থেকে সেই যে হেঁচকি শুরু হয়েছে কিছুতেই আর থামছে না। ছেলেটা একে তো কাহিল হয়ে পড়েছিল, এখন তার হার্টফেল করার অবস্থা। আমাদেরকে গাড়ি ডেকে হসপিটালে ভর্তি করতে হয়েছে।

শুনে তো আমরা একবোরে থ’। মনে মনে ভাবছি, এবার আমাদেরই বোধহয় পিঠ বাঁচানো দায় হবে। বদনদাকে হাতের কাছে না পেয়ে আমাদেরকেই হয়তো হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে যাবে কীনা কে জানে!

যদিও সেসব কিছু হল না। ওরা গজগজ করতে করতে চলে গেল—ব্যাটা বদ্‌না করবে ডাক্তারি! একবার তোর দেখা পেলে হয়। ছাল খুলে কেমন ডুগডুগি বানানো যায় সেটা দেখিয়ে দেবো তখন।

অধীর খানিকক্ষণ গুম হয়ে বসে থেকে হঠাৎ আমার দিকে ঘুরে দাঁড়াল—তুই কি এখনও ওর এই বেয়াদপি সহ্য করে যাবি?

কখ্‌খনও না। আমিও ঠিক করেছি, বদনদা আসুক আগে, এবার ওকে ভাল করে সাবধান করে দিতে হবে।

কিন্তু সেদিন বদনদা মেসে ফিরলই না।

পরের দিনও না।

তার পরের দিন সন্ধের সময় চোরের মতো চুপিচুপি ঘরে এসে ঢুকল। কেমন যেন দুঃখী—দুঃখী মুখ। আমাদের কিছু বলার আগেই মিনতি করল—দোহাই, কাউকে জানাস না, আমাকে হাতের কাছে পেলে ওরা আস্ত রাখবে না, পিঠের চামড়া খুলে নেবে বলেছে। ...ইস, একটুর জন্যে কী মারাত্মক ভুলটা হয়ে গিয়েছে মাইরি। তবে ব্রজটা এখন ভাল আছে, আমি তো সব খবরই রাখছি।

অধীরের মুখ চোখের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সে বোধহয় এবার ঝাঁপিয়েই পড়বে। কিন্তু বদনদাকে দেখে দুঃখও হয়। আমার সামনে বসে কেমন কাঁদো কাঁদো গলায় বলল—আমার কপালটা সত্যিই বড় খারাপ রে। তখন ভুল করে জ্বরের বদলে পেটখারাপের ওষুধ দিয়ে ফেললাম আর মাত্রাটাও ঠিক করতে পারিনি, তাই এমন একটা বিচ্ছিরি কান্ড ঘটে গেল। তবে একটা কথা জানবি, আমার উদ্দেশ্য কিন্তু মহৎ। তা সত্ত্বেও কেন যে সবাই আমাকে ঠিকমতো নিতে পারছে না...!