শতবর্ষে শ্রদ্ধাঘ্য
এভারেস্ট শৃঙ্গ অভিযানে অগ্রপথিক পথ প্রদর্শক জর্জ রবার্ট লে মারলি
রবিব্রত ঘোষ
মানুষের জীবনের সাথে আর ব্যর্থতা অঙ্গাঙ্গি ভাবে যুক্ত। জীবনকে যদি একটি বড় যুদ্ধ হিসেবে দেখা হয় তবে সেই যুদ্ধে কেউ সাফল্য লাভ করেছেন কেউ ব্যর্থতার হাত থেকে নিস্তার পাননি। গ্রীক পুরাণে সিসিফাস বলে একজনের কথা আছে। পাহাড়ের উপরে ওঠার চেষ্টা করছেন আর প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছেন।
ইংল্যান্ডের একটা রাজা ছিলেন যুদ্ধে ১৫-১৬ বার পরাজিত হয়েছেন, শেষে একটা গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে দেখলেন একটা মাকড়সা উপরে ওঠার চেষ্টা করছে আর পড়ে যাচ্ছে আবার উঠছে। শেষ পর্যন্ত উঠেই পড়ল। রাজা শিক্ষা পেলেন হেরে গেলে চলবেনা। সৈন্য সামন্ত যোগাড় করে আবার যুদ্ধে নামলেন এবং জিতে ফিরলেন।
ইংল্যান্ডের এক কবির একটি মহাকাব্য আছে যার নায়ক পরাজিত হয়েছেন বলা যেতে পারে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। কবি বলছেন এভরিথিং ইজ লস্ট। কিন্তু কোন জিনিসটা এখনো হারিয়ে যায়নি কোন জিনিসটা এখনো পরাজিত হয়নি? কবি বলছেন দা আনকংকার্ড উইল ফোর্স, অপরাজেয় ইচ্ছা শক্তি। যে ইচ্ছা শক্তিকে সম্বল করে মানুষ উঠে দাঁড়ায় রুখে দাঁড়ায় চলার পথে এগিয়ে যায়।
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় শিক্ষক বোধহয় ব্যর্থতা। সাফল্য মানুষকে আনন্দে উদ্বেলিত করে। কিন্তু ব্যর্থতা আমাদেরকে শিক্ষা দেয়, বুঝিয়ে দেয় কেন ব্যর্থ হয়েছ ঠিক কিভাবে চললে তুমি সফল হবে।
খুব সুন্দর একটি কথা বলেছিলেন বিবেকানন্দ। ফেলিওর ইস দ্যা বিউটি অফ লাইফ। এগিয়ে যাওয়ার পথে কোন মানুষটি ব্যর্থ হয়? যে একটি বিরাট জিনিস কে জয় করার চেষ্টা করে। তাকে কখনো দামানও যায় না সে পড়ে যেতেই পারে কিন্তু আবার ঠিক উঠে দাঁড়াবে, আবার রুখে দাঁড়াবে আবার চলতে শুরু করবে। খুব সুন্দর একটি উপমা দিয়েছিলেন বিবেকানন্দ বলছেন, একটা বিরাট বড় মাঠের মাঝে একটি বড় গাছ আছে আর সেই মাঠে প্রবলভাবে ঝড় চলছে। প্রবল ঝড়টি গাছটিকে দুমড়ে দিচ্ছে গাছটি নুইয়ে পড়ছে। কিন্তু যেই ঝড় চলে যাচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে গাছটি আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে।
এগুলি কিন্ত শুধু নীতিকথা বা উপদেশ কথা নয়, মানব সভ্যতার অগ্রগতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোন ব্যর্থতাই মানুষের ইচ্ছা শক্তিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ব্যর্থতা তুচ্ছ করেই মানুষ আজ নভোচারী।
আজ থেকে শতবর্ষ আগে এমনই এক দুর্দমনীয় ব্রিটিশ পর্বত অভিযাত্রী জর্জ হার্বাট লে ম্যালরির ও তাঁর সঙ্গী অ্যান্ড্রু আরভিনের এভারেস্ট শৃঙ্গ অভিযান নিয়ে আজ কিছু কথা শোন।
ম্যালরি স্বপ্ন দেখেছিলেন অত্যন্ত দুর্গম অত্যন্ত বিপদ সংকুল এভারেস্টের চূড়ায় উঠবেন। এই চিন্তা নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল শেষ পর্যন্ত মারাও গিয়েছিলেন কিন্তু সফল হয়েছেন কিনা সেটা আমরা কেউই জানিনা। বারবার ব্যর্থ হয়েছেন। একবার তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল বারবার তো ব্যর্থ হচ্ছেন তবু কেন এভারেস্টে উঠতে চান? উত্তর দিয়েছিলেন বিকজ ইট ইস দেয়ার। ওটা ওখানে আছে তাই।
আসলে এটাই হয়তো পশু পাখি বা অন্য জীবের সঙ্গে মানুষের পার্থক্য। অন্য প্রাণীরা নিজেদের প্রয়োজন মিটলেই তাদের যাত্রা শেষ। তারা কখনোই এভারেস্টে ওঠার কথা ভাববে না বিনা প্রয়োজনে। কারণ সেখানে তাদের খাবারদাবার নেই।মানুষ কিন্তু ঘরে খাবে আবার এভারেস্টে ওঠার কথা ভাববে সমুদ্রের অতলে গিয়ে সমুদ্রের রহস্য উন্মোচনের কথা ভাববে। কখনো সফল হবে কখনো ব্যর্থ হবে।
ম্যালরি একজন ইংরেজ পর্বতারোহী।
ইংল্যান্ডের উইনচেস্টার কলেজের ছাত্র হয়েছিলেন, সেখানেই একজন শিক্ষক তাকে আল্পস পর্বতমালা ভ্রমণের জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলেন। পরবর্তী কালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর, ম্যালরি আল্পস পর্বত এ আরোহণ করেন। এই সময় জীবিকার জন্য চার্টারহাউস স্কুলে পড়ানো শুরু করেন। খুব তাড়াতাড়ি তিনি ব্রিটিশ পর্বতারোহণ কারীদের মধ্যে একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তার পাহাড় অভিযান বন্ধ ছিল কিন্তু যুদ্ধের পর তিনি আবার পূর্ণ উদ্যম এ কাজ শুরু করেন ।
১৯২১ সালে ইংল্যান্ডে এভারেস্ট কমিটি গঠন করা হয় মাউন্ট এভারেস্টে অভিযান পরিচালনার জন্য।
এই কমিটির প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল পর্বতের শিখরে ওঠার সবচেয়ে কার্যকর পথ আবিস্কার করা।
ম্যালরি মাউন্ট এভারেস্ট কমিটির সদস্য জন পার্সি ফারার একটি চিঠিতে, ম্যালরিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে তিনি এভারেস্ট অভিযানে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী কিনা? ইংরাজী তে লেখা এই চিঠি তে ম্যালরিকে জানিয়েছিলেন এই গ্রীষ্মে এভারেস্টে একটি প্রচেষ্টা ঘটবে। পার্টি এপ্রিলের শুরুতে রওনা হবে এবং অক্টোবরে ফিরে আসবে। ম্যালরি প্রথমে এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক বোধ করেছিলেন। পরে ভেবে দেখেন এটি একটি অবিশ্বাস্য দুঃসাহসিক কাজ হবে তাই এবং জীবনের অন্যতম সেরা সুযোগ এই সব কথা ভেবে ম্যালরি অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন।
১৯২১ সালের ৮ এপ্রিল, ম্যালরি ইংল্যান্ডের এসেক্সের টিলবারি বন্দর থেকে একাই রওনা হন অভিযানের সদস্যরা ইতিমধ্যেই রওনা হয়েছিলেন বা ভারতে ছিল।
১৯২১ সালে প্রথম এভারেস্ট অভিযানের উদ্দেশ্যই চূড়ার পৌঁছানোর রাস্তা আবিষ্কার করা। ১৮ আগস্ট দু’মাস দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ম্যালরি ও আরো কয়েকজন ২২,৪৭০ ফুট আরোহণ করেন।
এর ফলে তারা এভারেষ্ট এ ওঠার রাস্তা আবিষ্কার করেন। পরেরদিন তারা আরো এগোনোর চেষ্টা করেন কিন্তু প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য অভিযান শেষ করতে বাধ্য হন।
২৯ অক্টোবর, ম্যালরি বোম্বে হয়ে দেশে ফিরে যান।
১৯২২ সালে ম্যালরি মাউন্ট এভারেস্ট অভিযান নিয়ে একটি বই ও লেখেন। একাধিক বক্তৃতাও দেন।
এই বছরই ম্যালরি ব্রিটিশ এভারেস্ট অভিযানের সদস্য হিসাবে আবার হিমালয়ে আসেন।
১ মে, তারা ১৬,৫০০ উচ্চতায় বেস ক্যাম্প স্থাপন করেন। ২০ মে, তারা ২৩,০০০ ফুট উচ্চতায় উঠেন। এরপর তারা অক্সিজেন ছাড়াই যাত্রা শুরু করেন এবং ২৫,০০০ ফুট উচ্চতায় উঠে আসেন। এখানেই রাত্রিবাস করেন। পরের দিন, সকাল ৮ টায়, চূড়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা শুরু করেন। সারাদিন চেষ্টা করেও রাতে তারা ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, তুষারপাত এবং তাঁবুতে পৌঁছান। ২৭ মে, তারা অক্সিজেন ব্যবহার করে। ২৭,৪০০ ফুট (৮,৩৫২ মিটার), অবধি ওঠেন। এর পর অবশ্য ক্ষুধা ও ক্লান্তিতে দুর্বল হয়ে পড়ায় তারা আর এগিয়ে যেতে পারেননি এবং নেমে আসেন।
জুনের শুরুতে, আবার অভিযান শুরু হয় এবার পরিকল্পনা ছিল অক্সিজেন ব্যবহার না করে ২৫,০০০ ফুট উচ্চতায় আরোহণ করা। ৭ জুন তারা অভিযান শুরু করে দুর্বিপাকে র সম্মুখীন হন ও সাতজন নিহত হয়। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ১৯২২ সালের অভিযানের সমাপ্তি ঘটে।
১৯২৪ সালে পরবর্তী অভিযান শুরু হয় ১ জুন। ম্যালরি অভিযান শুরুর আগে একটি চিঠি তে লেখেন, “বর্ষাকাল এগিয়ে আসছে। এর পর আর ওঠার সুযোগ পাবো কিনা জানি না। আমি এখানে পড়ে থাকতে চাই না। পরশুদিন আমরা যাত্রা শুরু করতে চাই। বেস ক্যাম্প থেকে শিখরে পৌঁছুতে সময় লাগবে মোট ছয় দিন।” অক্সিজেন ছাড়াই ম্যালরি ২৩,০০০ উচ্চতায় আরোহণ করেন। পরিকল্পনা ছিলো অক্সিজেন ছাড়াই চূড়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে। এবারে তারা আরো অনেক টা এগিয়ে ২৮,১২৬ ফুট উচ্চতায় ওঠেন। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার জন্য নেমে আস্তে বাধ্য হন।
৪ জুন, দুপুর ২:১০ টায় ম্যালরি এবং আরভিন, তাদের অভিযান শুরু করেন অক্সিজেন ব্যবহার করে, তারা ২৩,০০০ ফুট এ পৌঁছান।
৮ জুন ১৯২৪, দুপুরে ২৭,০০০ ফিট উচ্চতায় সেই ব্রিটিশদলের আরেক সদস্য ভূতাত্ত্বিক নোয়েল ওডেল ম্যালরি আর আরভিনকে শেষ দেখেন সাদা বরফের উপর দু’টি সচল বিন্দুর মত, এভারেস্টের চূড়া থেকে মাত্র হাজারখানেক ফুট নীচে, ওই ফার্স্ট বা আরো উপরে সেকেন্ড স্টেপের কাছে। তারপরেই মেঘের ঝাঁক এসে দৃশ্যপট মুছে দেয়। আগে দু’ দু’বার শৃঙ্গ জয়ের প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে খারাপ আবহাওয়ার কারণে। কিন্তু নোয়েল নিশ্চিত ছিলেন, এ যাত্রায় ম্যালরিরা বিজয়ী হবেনই হবেন, বিজয়শিখর যে প্রায় হাত-বাড়ালেই-ছোঁয়া-যাবে এমন দূরত্বে! বিকেল গড়িয়ে রাত নামে, এক সময় ভোরও হয়, ৯ই জুনের ভোর। কিন্তু ম্যালরিরা আর কখনো ফিরে আসেননি।
তারা এভারেস্ট জয় করেছিলেন নাকি ব্যর্থ হন সেই প্রশ্নের উত্তর আজও পাওয়া যায়নি।
পরবর্তিকালে ১৯৯৯ সালে এক অভিযাত্রী দল এভারেস্ট অভিযানের অগ্রপথিক পথপ্রদর্শক ম্যালরির মৃতদেহের সন্ধান পান সেন্ট্রাল রংবুক হিমবাহে। তাঁর প্রতি সম্মান দেখিয়ে সেখানেই তারা তাঁর মৃতদেহ শায়িত রেখে আসেন।
সম্প্রতি ১১অক্টোবর ২০২৪ ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের খবর যে জিমি চিনের নেতৃত্বে তাদের তথ্য চিত্র নির্মাণ দল সেপ্টেম্বরে আরভিনের আংশিক দেহাবশেষ খুঁজে পায় সেন্ট্রাল রংবুক হিমবাহ যেখানে আগে ম্যালরির দেহ আবিষ্কৃত হয়েছিল তার থেকে অন্তত ৭০০০ ফুট কম উচ্চতায় এই আংশিক দেহাংশ পাওয়া গেছে। ‘AC Irvine’ লেখা মোজা সহ একটি বূটজুতা। কিন্ত তাদের ক্যামেরার সন্ধান পাওয়া যায়নি। সেই ক্যামেরার সন্ধান পেলে জানা যেতেও পারে তাঁরা কেউ শৃঙ্গে উঠেছিলন কিনা। তখন হয়ত এভারেস্ট জয়ের ইতিহাস পুনরলিখন করতে হবে। কারণ তোমরা জান ১৯৫৩ সালে এডমন্ড হিলারী এবং নেপালের তেনজিং নোরগে এভারেস্ট শৃঙ্গে পা রেখে বিশ্বে প্রথম এভারেস্ট শৃঙ্গ জয়ের গৌরব অর্জন করেছেন। যদি তাঁদের কেউ শৃঙ্গে শেষপর্যন্ত উঠেও থাকেন তবুও তাঁদের প্রথম এভারেস্ট শৃঙ্গ জয়ীর সম্মান পাবেন না কারণ পর্বত অভিযানের নিয়ম অনুযায়ী শৃঙ্গে উঠলেই হবে না নিচে ফিরে আসতেও হবে। সে যাইহোক একশ বছর আগে ম্যালরির এই কৃতিত্ব পর্বত অভিযাত্রীদের কাছে অটুট থাকবে। ম্যালরি এভারেস্ট শৃঙ্গ অভিযানে অগ্রপথিক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন, থাকবেন। সেই সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তাঁর সঙ্গী কনিষ্ঠতম সদস্য মাত্র ২২ বছর বয়সী অ্যান্ড্রু কামি স্যান্ডি আরভিন।