এ.‌ আই

সন্দীপ পাল

পিড়িং পিড়িং আওয়াজ শুনেই পাশের ঘরে ছুটলো আরুষ। খাবার ফেলে তার এই দৌড়ে যাওয়া দেখে মা রেগে গজগজ করতে থাকে। কারণ ছেলে যে ওয়াটস্অ্যাপ মেসেজের আওয়াজ শুনে উঠে গেছে তা সে বিলক্ষণ জানে। মায়ের গজগজানি থামানোর জন্য পাশের ঘর থেকেই আরুষ চেঁচিয়ে বলে-“দু-মিনিট দাঁড়াও যাচ্ছি।” মা একথা শুনে আরো রেগে যায়- “কেন দু-মিনিটের মধ্যে তুই কি এমন করবি যা না করলে একটা মারাত্মক কিছু ঘটে যাবে?” তাছাড়া মা জানে ওয়াটস্অ্যাপে উত্তর দিতে ব্যস্ত আরুষের এই ‘দু-মিনিট’ শুধুই কথার কথা।

এখন বেশ খানিকক্ষণ ওদের কথা চালাচালি চলবে। ওদের মানে আরুষদের স্কুলের বন্ধুদের আটজনের একটা ওয়াটস্অ্যাপ গ্রুপ আছে ‘অক্টাহোলিক’ নামক এই গ্রুপের মেম্বারটা রাত দশটা থেকে এগারোটা, এক ঘণ্টা

নিজেদের মধ্যে নিয়ম করে কথা বলবে। আরুষের কাছেই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এসব জেনেছে তার মা।

আরুষের মা নিলীমা ছেলে মানুষ করার জন্য শিক্ষিকার চাকরি ছেড়েছে সেই কোন কালে আরুষের বসয় যখন সবে ছয়, ক্লাস ওয়ানে পড়ে। এখন সে দশম শ্রেণির ছাত্র। সামনের বছর বোর্ডের পরীক্ষা। এহেন আরুষের লেখাপড়া-রেজাল্ট নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন তার মা। আর এই সব ব্যাপারে আরুষের বাবার নির্লিপ্ততা দেখে মায়ের উত্তেজনা আরো বাড়ে। বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলে- “কি গো ছেলের পড়াশোনা নিয়ে কি তোমার কোনো চিন্তা নেই? রাতদিন মোবাইলে পড়ে আছে ক্লাস টেনের একজন ছেলে। দেখেও তুমি কিছু বলবে না?”

আরুষের বাবা বোঝে নিলীমা অত্যন্ত রেগে গেছে। তাই তাকে শান্ত করতে উদ্যত হয়।

—“অত চেঁচামেচি কোরো না। বুঝিয়ে বলো ওকে। তাছাড়া খুব বেশি তুমি ওদের মোবাইল ছাড়া রাখতে পারবে না। এখন খাতা বই পেনের মতোই মোবাইল ফোন পড়াশোনার অবিচ্ছেদ্য উপাদান হয়ে গেছে। প্রযুক্তির ব্যবহারকে কি খুব বেশি এড়িয়ে চলা যায় নিলীমা।” এই সব কথার মাঝেই পাশের ঘর থেকে ফিরেএসে আবার খেতে শুরু করে আরুষ। হালকা হেসে মায়ের রাগ ভাঙাতে আরুষ বলে- “মা এবার তো তুমি ফেসবুকে একটা অ্যাকাউন্ট খোলো। দেখবে স্কুলের বন্ধুদেরও আবার ফিরে পাবে। আমি তোমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দেবো।” নিলীমা আরুষের পাতে আরো একটা রুটি দিয়ে বলে- “থাক এখন দরকার নেই। এতেই কাজ করে শেষ করতে পারছি না। আর তখন শুধু তোর মতো সব কাজ ফেলে মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকবো। টেকনোলজির উন্নতির নামে মানুষের এই পিছনে হাঁটা মানা যায় না।”

আরুষ বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করে- “পিছনে হাঁটা? পুরোনো বন্ধু, দূরের বন্ধুদের ফিরে পাওয়া মানে পিছনে হাঁটা নাকি?”

মা বলে- “ওটা মানে পিছনে হাঁটা বলছি না-এই যে মোবাইলে মুখ গুঁজে সবসময় পড়ে থাকা। কারোর সঙ্গে কোনো কথা নেই, পাশের মানুষটাকেও ওয়াটস্অ্যাপ করছি অথচ কথা বলছি না-এই সব মানতে পারবো না- তাতে কেউ ব্যাকডেটেড বলে বলুক।”

আরুষ বলে- “এখন তুমি কি এসব অ্যাভয়েড করতে পারবে নাকি? এরপর এ.আই. হলে কি করবে?” এই কথা শুনে আরুষের বাবা নিউজপেপার থেকে চোখ তুলে আরুষের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে- “এ আই নিয়ে কোনো আইডিয়া আছে?” ইন্টেলিজেন্স নিয়ে দারুণভাবে কাজ শুরু হয়েছে হোল ওয়ার্ল্ডে। ঠিক ঠাক কাজ শুরু হলে বহু প্রবলেম সলভ হয়ে যাবে।”

শুনে বাবা বলেন “হবে হয়ত তবে নতুন করে অনেক প্রবলেম তো তৈরী হবার সম্ভাবনার দরজাও খুলবে। ইনফ্যাক্ট অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন এ আই আগামীতে পৃথিবীর কাছে মনুষ্য সৃষ্ট সবচেয়ে বড়ো তিনটে বিপদের মধ্যে একটা হতে চলেছে।”

আরুষ জানতে চায়- “কি বিপদ?”

বাবা বলে- “যেমন ক্লাইমেট চেঞ্জ, জনবিস্ফোরণ বা জনসংখ্যার প্রচুর বৃদ্ধি তেমন এ.আই বা এই আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স আগামী মানুষের সামনে একটা বড় বিপদ হিসাবে দাঁড়াতে পারে।”

— “কি ভাবে?”

— “আশঙ্কা করা হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত এ.আই.-এর ব্যবহার কোটি কোটি মানুষের কাজের রাস্তা বন্ধ করে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছে।

নিলীমা আরুষের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে- “থাক এখন ওসব দেশদুনিয়া সামনে বিপদ তোর। তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠে পড়তে বস।”

আরুষ পড়ার টেবিলে বসে ভাবতে থাকে “কি যে পুরোনো লোকেরা এত বিপদ বিপদ করে। আমার যদি একটা বুদ্ধিমান সঙ্গী পাওয়া যায় যে আমার যে কোন সমস্যার সমাধান করবে এক চুটকিতে তবে বিপদ কিসের? আর তাছাড়া এ আইতো ব্যবহৃত হবে আমার নিয়ন্ত্রণে।”

— “কি ভাবছো?”

প্রশ্ন শুনে চমকে পিছনে তাকায় আরুষ। তাকিয়েই ভিরমি খাবার যোগাড়। দেখে পিছনে দাঁড়িয়ে যে মুচকি মুচকি হাসছে সে। অবিকল তার মতোই দেখতে আরুষ চরম অবাক হয়ে নিজের গায়ে হাত বোলায়-সেই লোকটির হাসি চওড়া হয়- “হ্যাঁরে বাবা ওটা তুমিই-আমি এটা আলাদা আরুষ নই। আরুষের তো বিস্ময়ে চোখ কপালে ওঠে- “কে তুমি?”

ছেলেটি হেসে বলে- “আমি তোমাকে সাহায্য করবো বলে এসেছি তোমার সঙ্গী এ.আই। যেখানে তুমি বিপদে পড়বে সেখানে আমি তোমার হয়ে গিয়ে সামলে নেবো।”

আরুষ বলে- “বলছো কি? কে পাঠালো তোমায়?” ছেলেটি মিটিমিটি হেসে বলে- “তুমিই এনেছো তোমারই চাওয়া।”

আরুষ উত্তেজনায় সামান্য রেগে যায়- “ইয়ার্কি ছাড়ো কি ব্যাপার বলো কি চাও তুমি।” ছেলেটি বলে - “আমার কিছু চাওয়া নেই। তোমার চাওয়াই আমার চাওয়া। যেমন ধরো তুমি যদি বলো যে তোমার বন্ধু শ্রেয়াণ ঠিক কি কি বই পড়ে ফিজিক্স তৈরী করছে যা তোমায় ও বলতে চাইছে না-আমি বলে দিতে পারি।”

আরুষ বুঝতে পারে ছেলেটি বুদ্ধিমান আছে-এমনকি মনের কথাও পড়ে দিতে পারছে। একে যদি ব্যবহার করা যায় তো অনেক কিছুই ও করে নিতে পারবে।

ছেলেটি বলে ওঠে- “হ্যাঁ তা পারবে। ঠিকই তবে সাবধান?”

আরুষ চমকে তাকায় - “কি পারবে?”

ছেলেটি বলে- “ওই যে ভাবছো আমাকে ব্যবহার করবে।” এবার আরুষ ভয় পায় ও তো মনের কথাও বুঝতে পারবে। ছেলেটি বলে “হ্যাঁ বুঝতে পারছি তাই বলছি সাবধানে আমাকে কিন্তু চাকর ভাববে না। তাহলে আমি তোমার মনের কথা ফাঁস করে দেবো।” তাছাড়া এখন তুমি ছাড়া আমায় কেউ দেখতে পাবে না। কিন্তু অন্য কেউও দেখতে পাবে আমি মনে করলেই। তখন কোনটা আসল তুমি, আর কে তোমার এ.আই বোঝা অত সহজ হবে না-বুঝতে পারছো তো-কেমন সমস্যায় পড়বে তুমি।” আরুষ বোঝে এই যে ছেলেটি তার নিয়ন্ত্রণে তো আসবেই না বরং তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকবে প্রতি পদে পদে। আসলে আরুষই ওর চাকর হয়ে যাবে। আশঙ্কায় গদ গদ করে ঘামতে থাকে আরুষ। ছেলেটি আরুষের কাঁধে হাত দিয়ে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে- “ওঠো অত ভয় পেয়ো না-আমি অত খারাপ নই।” এখন ওঠো।

আরুষ ধড়মড়িয়ে ওঠে - মা বলে- “কি করে ওঠ। টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেছিস-একেবারে ঘেমে নেয়ে একসা হয়ে গেছিস-তো। ওঠ, উঠে শুয়ে পড়। কাল ভোরে তুলে দেবো।”

আরুষ চারপাশে তাকায়। মা জানেত চায়-কি দেখছিস? অমন করে। বলে- “না কিছু না।” আরুষ ভাবতে থাকে- “তবে কি ও স্বপ্ন দেখছিলো নাকি...?”

— “কিরে কি ভাবছিস বসে ওঠ-জল খা”-মা আরুষের দিকে এক গ্লাস জল এগিয়ে দিয়ে বলে। আরুষ মায়ের হাত থেকে জলের গেলাস নিয়ে ঢক ঢক করে জল খেয়ে বলে- “কাল ভোরে আমায় তুলে দিও।”