বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপিত হয় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। আমাদের চারপাশের পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকারকল্পে সচেতনতাবৃদ্ধি করাই এই-দিবস পালনের উদ্দেশ্য। ১৯৬৮ সালে সুইডেন সরকার বিশ্বের অর্থনীতি ও সামাজিক পরিষদের কাছে, পরিবেশ দূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি চিঠি পাঠায়। পরবর্তীতে ৫ জুন ১৯৭২ এ, সুইডেনের স্টকহোম সহরে পরিবেশ নিয়ে আলোচনার হয়। সেই আলোচনার প্রেক্ষিতে ১৯৭৪ সালের ৫ জুন পরিবেশ দিবস পালিত হয়ে আসছে বিশ্বে। সুইডেন বা বিশ্বের উন্নত দেশগুলি পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার নিয়ে সাড়ম্বড়ে যে উদ্যোগ নিয়েছে তাকে আমরা সাধুবাদ জানাই।
পরিবেশ নিয়ে পাশ্চাত্যবাসী ভাবনার সূচনা করছেন বলে দাবি করেন।
কিন্তু এর অনেক আগে রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখনীর মাধ্যমে, কর্মের মাধ্যমে পরিবেশ সম্পর্কে তাঁর সুচিন্তিত অভিমত প্রকাশ করেছিলেন। ছাত্রাবস্থায় নেতাজী সুভাষচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে যান শান্তিনিকেতনে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে। এর ২৪ বছর পর, রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে, ৮ ডিসেম্বর ১৯৩৮ সুভাষচন্দ্র আসেন কর্ণওয়াল স্ট্রীটে (২১০নং) শ্রীনিকেতনের শিল্পভাণ্ডার ও প্রদর্শনী উদ্বোধন করতে।
এই অনুষ্ঠানে শ্রীনিকেতনের শিল্পভাণ্ডার ও প্রদর্শনীর আদর্শ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখিত ভাষণ পাঠ করেন, তাতে সুভাষচন্দ্রকে তিনি স্বাগত জানিয়ে লেখেন—“সৃষ্টিকাজে আনন্দ মানুষের স্বাভাবসিদ্ধ, এইখানেই সে পশুদের থেকে পৃথক এবং বড়ো। পল্লী যে কেবল চাষবাস চালিয়ে আপনি অল্প পরিমাণে খাবে এবং আমাদের ভূরিপরিমাণে খাওয়াবে তা তো নয়। সকল দেশেই পল্লীসাহিত্য, পল্লীশিল্প, পল্লীগান, পল্লীনৃত্য নানা আকারে স্বতঃস্ফূর্তিতে দেখা দিয়েছে। কিন্তু আমাদের কালে বাহিরের পল্লীর জলাশয় যেমন শুকিয়েছে, কলুষিত হয়েছে, অন্তরে তার জীবনের আনন্দ উৎসের সেই দশা। সেই জন্য যে রূপসৃষ্টি মানুষের শ্রেষ্ঠধর্ম, শুধু তার থেকে পল্লীবাসীরা যে নির্বাসিত হয়েছে তা নয়, এই নিরন্তর নীরসতার জন্যে তারা দেহে প্রাণেও মরে। —আমাদের কর্মব্যবস্থায় আমরা জীবিকার সমস্যাকে উপেক্ষা করিনি, কিন্তু সৌন্দর্যের পথে আনন্দের মহার্ঘ্যতাকেও স্বীকার করেছি।”১ সুভাষচন্দ্রের কাছে কবি অনুরোধ করেন— “তোমরা স্বদেশের প্রতীক। তোমাদের দ্বারে আমার প্রার্থনা, রাজার দ্বারে নয়, মাতৃভূমির দ্বারে। সমস্ত জীবন দিয়ে আমি যা রচনা করেছি দেশের হয়ে তোমরা তা গ্রহণ করো।”২ সুভাষচন্দ্র কবির এই আবেদনে বিনম্রভাবে সাড়া দেন এবং তাঁর কথা বলতে গিয়ে, ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের ছাত্রাবস্থায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে শান্তিনিকেতনে এসে তাঁর সঙ্গে যে সাক্ষাৎ, তা ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন— “প্রায় ২৪ বৎসর পূর্বে আমরা কয়েকজন ছাত্র কবিগুরুর নিকট যাই তাঁহার নিকট হইতে কিছু উপদেশ লইতে।— তিনি আমাদের পল্লীসংগঠনের কথা বলেন। তখন বুঝিতে পারি নাই —পরে যতই দিন যাইতে লাগিল ততই বুঝিতে পারিলাম তাহার মূল্য কতখানি।”৩ এখান থেকে বোঝা যায়, প্রকৃতি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ, পাশ্চাত্য দেশের অনেক আগেই ভাবিত ছিলেন এবং ‘পল্লীসংগঠন’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিলেন।
বঙ্গ তথা ভারতবর্ষের ভিত্তি হল কৃষিসভ্যতা। শহরে যাঁরা আছেন তাঁদের শিকড়ের সন্ধান করলেই উঠে আসবে, পল্লীগ্রামের সঙ্গে তাদের নিবিড় যোগ একদা ছিল। অন্ন-বস্ত্র-সুখের উপকরণ সবই আসে পল্লীবাসীর শ্রমে উৎপাদিত ফসল থেকে। অথচ এই পল্লীবাসী সবচেয়ে অবহেলিত হয়, অপমানিত হয়, অত্যাচারিত হয়, প্রদীপের নিচের অন্ধকারে ডুবে থাকে এরা। রবীন্দ্রনাথ পল্লীবাসীকে এই বহু বঞ্চনার অন্ধকার থেকে মুক্ত করার কথা বারবার ভেবেছিলেন, পল্লী উন্নয়নের জন্য নানান পরিকল্পনা করেছিলেন। উন্নত কৃষিপ্রযুক্তির কথা, মহাজনী ঋণ থেকে গরিব চাষিদের ত্রাণের কথা, গ্রামের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নের কথা ভেবেছিলেন। নিজের পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও বন্ধুপুত্র সন্তোষ মজুমদার-কে কৃষিবিদ্যায় পারদর্শী করতে আমেরিকায়ও পাঠিয়েছিলেন। এসব তিনি ভেবেছিলেন ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে ঘটে যাওয়া রুশ বিপ্লবের আগে।
পল্লির উন্নয়নের কথা যেমন রবীন্দ্রনাথ ভেবেছেন তেমনি ভেবেছেন, মানবসভ্যতার সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় সংযোগের কথা। মানবসভ্যতা এই সংযোগের কথা যত অস্বীকার করে ভোগের আয়োজনে ধাবিত হচ্ছে ততই মানুষ বাসযোগ্য বিশ্বকে হারাচ্ছে।
প্রকৃতি হলেন আদি-মা, তাঁর সন্তানসম মানুষকে, তাঁর সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকতে হবে- রবীন্দ্রনাথ তা গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন। তাই ‘বসন্ত-উৎসব’, ‘বর্ষামঙ্গল’, ‘হলকর্ষণ’ সহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন তাঁর শান্তিনিকেতনে। এর ফলে বৃক্ষশূন্য শান্তিনিকেতনকে বৃক্ষময় করে তুলেছেন আশ্রমিকগণ। আশ্রম হয়ে ওঠে প্রাচীন ঋষিদের তপোবনের মতো শান্তির নীড়। প্রকৃতির সঙ্গে শান্তিনিকেতনকে তিনি একসূত্রে বাঁধতে চেয়েছিলেন। শুধু বৃক্ষরোপণ নয়, সেই সঙ্গে প্রকৃতির সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য ঋতু-উৎসবের আয়োজন করলেন। সৃষ্টি করে চললেন অমর সাহিত্য— ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’, ‘শারদোৎসব’, ‘ফাল্গুনী’, ‘প্রকৃতি-পর্যায়ে’র সঙ্গীতসহ নানান সৃজনকথা।
রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ ১৯০৭ সালে ঋতু-উৎসব শুরু করেন। ১৮ জানুয়ারি শ্রীপঞ্চমীর দিন বসন্তের স্তুতির আয়োজন করেছিলেন তিনি আদি কুটিরে। শ্রীপঞ্চমীর দিনেই বসন্ত সমাগমের প্রথম পদক্ষেপ ঘটে। তারপর কেটে যায় ১৩ টি বছর- ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে (১৩২৭), শ্রীপঞ্চমীর দিন আম্রকুঞ্জ-এ সভা করে ‘বসন্ত-উৎসব’ পালিত হয়। দিনেন্দ্রনাথের উৎসাহে ‘ফাল্গুনী’ নাটকের সমস্ত গানগুলি এই-উৎসবে গীত হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে এই সময় থেকেই শান্তিনিকেতনে, প্রতি বছর বসন্ত-উৎসব পালিত হয়, যা এখন বিশ্বখ্যাত।
শান্তিনিকেতন পত্রিকায়, ফাল্গুন সংখ্যায় ১৩২৭, এই বসন্ত-উৎসব সম্পর্কে, বর্ণনা করা হয় - “গত পঞ্চমীর দিন আশ্রমে বসন্ত-উৎসব খুব সমারোহের সহিত সম্পন্ন হইয়াছিল। শারদোৎসবের ন্যায় বসন্ত-উৎসবেও প্রাঙ্গণে বিচিত্র আলপনা দেওয়া হইয়াছিল। এবং জ্যোৎস্নালোকে তাহার চতুর্দিকে আশ্রমবাসী সকলে সমবেত হইয়াছিলেন। সেখানে ‘ফাল্গুনী’র প্রায় সমস্ত গান গীত হইয়াছিল। “এরপর থেকে প্রতি বছর বসন্ত-উৎসব পালিত হয়েছে শান্তিনিকেতনে এবং ১৯৪০ পর্যন্ত প্রায় প্রতি বছর এই-উৎসবে উপস্থিত থেকেছেন রবীন্দ্রনাথ এবং গানের ডালি উপহার দিয়েছেন। ১৯৪১ অসুস্থতার কারণে বসন্ত-উৎসবে সশরীরে অনুষ্ঠান ক্ষেত্রে এসে যোগ দিতে পারেননি। সে-কষ্টের কথা কবি লিখেছেন—
“আরবার ফিরে এল উৎসবের দিন/
বসন্তের অজস্র সম্মান /
রুদ্ধ কক্ষে দূরে আছি আমি/
এ বৎসর বৃথা হল পলাশবনের নিমন্ত্রণ।”
ক্ষিতিমোহন সেন অধ্যাপক রূপে শান্তিনিকেতনে যোগ দেন ১৩১৫ বঙ্গাব্দে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপর বর্ষা-উৎসবের নবরূপায়ণের দায়িত্ব দেন। এই বছরেই কবির ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতে ‘বর্ষা-উৎসব’ পালিত হয়। বিধুশেখর এই উৎসবে যোগ দিলেন। বেদাদি গ্রন্থ থেকে বর্ষার উপযোগী সংস্কৃত স্তোত্র ছাত্রদের দিয়ে পাঠ করানো হল।
‘শারদোৎসব’ নাটক (১৩১৫ বঙ্গাব্দে) লেখার পর, কবি একে একে ঋতুকে কেন্দ্র করে নাটক লিখতে শুরু করেন। কবি নিজেই জানিয়েছেন ‘’শারদোৎসব থেকে আরম্ভ করে ফাল্গুনী পর্যন্ত যত নাটক লিখেছি, যখন বিশেষ করে মন দিয়ে দেখি তখন দেখতে পাই প্রত্যেকের ভিতরকার ধুয়োটা ঐ একই।” এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কবিতার নিচের অংশ স্মরণীয়—
“শরতে হেমন্তে শীতে বসন্তে নিদাঘে বরষায় অনন্ত সৌন্দর্যধারে যাঁহার আনন্দ বহি যায় সেই অপরূপ, রূপের নিকেতন নব নব ঋতুরসে ভ’রে দিল সবাকার মন। প্রফুল্ল শেফালি কুঞ্জ যাঁর পায়ে ঢালিছে অঞ্জলি, কাশের মঞ্জুরীরাশি যার পানে উঠিছে চঞ্চলি- স্বর্ণদীপ্তি আশ্বিনের স্নিগ্ধ হাস্যে সেই রসময় নির্মল শারদরূপে কেড়ে নিল সবার হৃদয়।” (‘প্রশ্রয়’, ভারতী, কার্তিক ১৩১৫)
রবীন্দ্রনাথের উৎসাহে, সুযোগ পেলেই বৃক্ষরোপণ করার চেষ্টা করা হয় শান্তিনিকেতন এবং আশেপাশের অঞ্চলে। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ২৫ বৈশাখ রবীন্দ্রনাথের জন্মোৎসব পালনের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ করা হয়। ‘মরুবিজয়ের কেতন ওড়াও শূন্যে’ গান গেয়ে ‘অশ্বত্থ’, ‘বট’, ‘বিল্ব’, ‘অশোক’, ‘আমলকি’ রোপণ করা হয়।
১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুলাই ‘বর্ষামঙ্গল’ উদযাপিত হয় শান্তিনিকেতনে। রথীন্দ্রনাথের পত্নী প্রতিমা দেবীর টবে লাগানো বকুল চারা তুলে আনা হয়। বালিকাবেষ্টিত পরিবেশে রোপণ করা হয় ঐ চারাটিকে। এই উপলক্ষে ১৩ জুলাই, কবি রচনা করেন ‘ক্ষিতি’, ‘অপ’, ‘তেজ’, ‘মরুৎ’, ‘ব্যোম’ এবং ‘মঙ্গলাচরণ’ নামে এই ছয়টি কবিতা এবং ১৪ জুলাই কবিতাগুলি পাঠিত হয় এই উৎসবে।
রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পরের বছর ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের বাইশে শ্রাবণে, রবীন্দ্রনাথের স্মরণে বৃক্ষরোপণ-উৎসবের সূচনা হয়। এখন প্রতি বাইশে শ্রাবণ দিকে দিকে বৃক্ষরোপণ করা হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে। ১৪-২০ জুলাই ‘অরণ্য-সপ্তাহ’ পালনের যে কর্মসূচি প্রতি বছর উদযাপিত হয়, বঙ্গে তথা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, রবীন্দ্রনাথের বৃক্ষরোপণ উৎসবের ভাবনা, সম্ভবত কাজ করেছে। ভারত সরকারের এই উৎসবের সূচনা হয় জুলাই ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে।
পরের দিন ১৫ জুলাই (১৯২৮) ‘হলকর্ষণ’ উৎসব পালিত হয়, রবীন্দ্রনাথের চেষ্টায়। কৃষিসভ্যতার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাতে রবীন্দ্রনাথ এই উৎসবের অবতারণা করেছিলেন। কবি এই- উৎসবে নিজ হাতে লাঙ্গল চালিয়েছেন সানন্দে। নির্মলকুমারী মহলানবিশকে লেখা চিঠিতে হলকর্ষণে অংশগ্রহণের কথা সানন্দ উল্লেখ করেন রবীন্দ্রনাথ- “আজ (২৫ শ্রাবণ ১৩৩৬) সুরুলে হলচালন হবে। লাঙল ধরতে হবে আমাকে। বৈদিক মন্ত্র-যোগে কাজটা করতে হবে ব’লে এর অসম্মানের অনেকটা হ্রাস হবে। বহু হাজার বৎসর পূর্বে এমন একদিন ছিল যখন হাল-লাঙ্গল কাঁধে করে মানুষ মাটিকে জয় করতে বেরিয়েছিল, তখন হলধরকে দেবতা বলে দেখেছে, তার নাম দিয়েছে বলরাম। এর থেকে বুঝবে নিজের যন্ত্রধারী স্বরূপকে মানুষ কতখানি সম্মান করেছে।—”
প্রকৃতির বক্ষতলে রয়েছে অমৃতসম পানীয় জলের বিপুল আয়োজন। কূপ ও পুকুর খননের পরে মানুষ তা পান করে, চাষের কাজে লাগায়। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের গ্রীষ্মে দাবদাহে জলাভাব ও অন্নাভাব দেখা দেয়। ‘দুর্ভিক্ষ’ ও জলাভাব কবিকে ভাবিয়ে তোলে। ‘শান্তিনিকেতনের উপকন্ঠস্থিত’ যে জলাশয় ছিল, তা থেকে পাঁক তুলে সংস্কারে ব্রতী হন শান্তিনিকেতন কর্তৃপক্ষ। ‘কাজ শেষ’ হয়ে গেলে জলাশয়ের বাঁধের উপর বর্ষামঙ্গল উৎসবে কবি উপস্থিত হয়ে, কৃষ্ণচূড়া চারা রোপণ করেছিলেন। এই প্রসঙ্গের উল্লেখ করে রবীন্দ্রনাথ সুধীরচন্দ্র কর মহাশয়কে চিঠি লিখেছিলেন- “যে সময়ে দাতার অভাব ছিল না ব’লে বাংলাদেশের গ্রামে জলের অভাব ছিল না সেই সময়ে ভুবনডাঙার জলাশয়ের সৃষ্টি। এরই জলসঞ্চয়ের উপর চারি দিকের পাঁচখানি গ্রামের তৃষ্ণা নিবারণ ও ফসল-খেতে জলসেচন নির্ভর করে। ক্রমেই এর জল এসেছে শুকিয়ে, জলাশয়ের পরিধি এসেছে সংকীর্ণ হয়ে, অসহায় গ্রামের লোকের দুঃখের অন্ত নেই। পঙ্কোদ্ধার ক’রে এই জলাশয়কে যথাসম্ভব ব্যবহারযোগ্য করবার চেষ্টায় দরিদ্র গ্রামবাসীরা ঋণযোগে কিছু অর্থ সংগ্রহ করেছে। তাদের পক্ষে এই দুঃসাধ্য অধ্যাবসায়ে সাহায্য করার জন্য আমরা সকলকে আহ্বান করি। একথাও স্মরণ করা কর্তব্য, দারুণ দুর্ভিক্ষের দিনে প্রত্যহ তিন শত লোক এই কর্ম উপলক্ষে অন্ন উপার্জন করতে পারছে, এমন অবস্থায় অতি সামান্য দানও মূল্যবান হয়ে উঠবে। ইতি ১লা বৈশাখ ১৩৪৩৷” ৪
জলাভাব দূরের চেষ্টা হল জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে, সেই সঙ্গেই সৃষ্টি হল ‘তিন শত লোক’-এর কর্মসংস্থান, দুর্ভিক্ষের দিনে তা কম কথা নয়। রবীন্দ্রনাথের এই পুকুর সংস্কারের আদর্শ, পরবর্তী স্বাধীন-ভারতে, গ্রামের অভাবী নরনারীর জন্য ‘১০০দিনের কাজ প্রকল্পে’র সৃষ্টিতে, সম্ভবত প্রেরণা জুগিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি চেতনার মিশে আছে কবির নাড়ীর যোগ। কবি পুরীর সমুদ্র দেখতে দেখতে অনুভব করছিলেন যে, সমুদ্র হল ‘আদিজননী’, আর বসুন্ধরা হল তার কন্যা। কবি হলেন বসুন্ধরার ‘শিশু’।
“হে আদিজননী সিন্ধু, বসুন্ধরা সন্তান তোমার, /
একমাত্র কন্যা তব কোলে।
—আমি পৃথিবীর শিশু বসে আছি তব উপকূলে,/
শুনিতেছি ধ্বনি তব।” (সমুদ্রের প্রতি, ১২৯৯)
কবি নিজেকে পৃথিবীর শিশু বলে ভাবেন, তিনি চারপাশকে তাঁর মতো করে অনুকূলভাবে পাচ্ছেন না, তাই তিনি মা বসুন্ধরার কোলে ফিরে যেতে চাইছেন-
“আমারে ফিরায়ে লহো, অয়ি বসুন্ধরে, /
কোলের সন্তান তব কোলের ভিতরে/
বিপুল অঞ্চল-তলে।—” (বসুন্ধরা, সোনার তরী, ১৩০০)
কবির সঙ্গে বসুন্ধরার যোগ, সন্তানের সঙ্গে জননীর যেমন যোগ। ঠিক তেমনি কবি অনুভব করেন প্রকৃতির সঙ্গে মানবসভ্যতার যোগ বিশ্বসৃষ্টির উৎস লগ্ন থেকেই। এই সত্য নানাভাবে কবি ব্যক্ত করেছেন। এই সম্পর্কে অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন। ‘পল্লীপ্রকৃতি’ (মাঘ ১৩৬৮) নামক প্রবন্ধ-গ্রন্থের অন্তর্গত প্রতিটি প্রবন্ধে পরিবেশ সচেতনতার কথা ব্যক্ত করেছেন রবীন্দ্রনাথ। বিশেষ করে ‘উপেক্ষিত পল্লী’, ‘অরণ্যদেবতা’, ‘হলকর্ষণ’, ‘জলোৎসর্গ’ প্রবন্ধ এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘অরণ্যদেবতা’- যেটা রবীন্দ্রনাথ কথিত শান্তিনিকেতনে হলকর্ষণ ও বৃক্ষরোপণ-উৎসবের পাঠ করা হয়েছিল।
‘অরণ্যদেবতা’ থেকে কিছু অংশ স্মরণ করলে কবির প্রকৃতি-চেতনার আনুপূর্বিক পরিচয় পাওয়া যেতে পারে-
“সৃষ্টির প্রথম পর্বে পৃথিবী ছিল পাষাণী, বন্ধ্যা, জীবের প্রতি তার করুণার কোনো লক্ষণ সেদিন প্রকাশ পায় নি। চারিদিকে অগ্নি-উদগীরণ চলছিল, পৃথিবী ছিল ভূমিকম্পে বিচলিত। এমন সময় কোন সুযোগে বনলক্ষ্মী তাঁর দূতীগুলিকে প্রেরণ করলেন পৃথিবীর এই অঙ্গনে, চারি দিকে তাঁর তৃণশষ্পের অঞ্চল বিস্তীর্ণ হল, নগ্ন পৃথিবীর লজ্জা রক্ষা হল। ক্রমে ক্রমে এল তরুলতা প্রাণের আতিথ্য বহন করে। তখনো জীবনের আগমন হয়নি; তরুলতা জীবের আতিথ্য এর আয়োজনে প্রবৃত্ত হয়ে তার ক্ষুধার জন্য এনেছিল অন্ন, বাসের জন্য দিয়েছিল ছায়া।”
প্রকৃতি-মায়ের সুরক্ষাবলয়ে মানবসভ্যতা সুখে ছিল। কিন্তু তাতে বাদ সাধলো মানুষের অপরিমেয় লোভ, জীবন যাত্রায় এলো ভোগের দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা। সে কথা রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন তাঁর এই প্রবন্ধে - “মানুষ অমিতচারী। যতদিন সে অরণ্যচর ছিল ততদিন অরণ্যের সঙ্গে পরিপূর্ণ ছিল তার আদান প্রদান। ক্রমে সে যখন নগরবাসী হল তখন অরণ্যের প্রতি মমত্ববোধ যে হারাল; সে তার প্রথম সুহৃদ, দেবতার আতিথ্য যে তাকে প্রথম বহন করে এনে দিয়েছিল, সেই তরুলতাকে নির্মমভাবে নির্বিচারে আক্রমণ করলে ইঁটকাঠের বাসস্থান তৈরি করার জন্য। —প্রকৃতির সহজ দানে কুলোয় নি, সে নির্মমভাবে বনকে নির্মূল করেছে। তার ফলে আরব মরুভূমিকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ হয়েছে।”
কালিদাসের মতো যে ডালে বসে আছে মানুষ, সেই ডালটাই কেটে চলেছে মানুষ, আহ্বান করে চলেছে মরুভূমিকে। এই বিপদ থেকে মুক্তি পেতে কবির নির্দেশ— “সেই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে আবার আমাদের আহ্বান করতে হবে সেই বরদাত্রী বনলক্ষ্মীকে- আবার তিনি রক্ষা করুন এই ভূমিকে, দিন তাঁর ফল, দিন তাঁর ছায়া।” ৫
কবিরা তো ত্রিকালদর্শী, তাঁরা পৃথিবীর উৎস-লগ্ন থেকে মানবসভ্যতার ভবিষ্যতের কথা ভাবেন। সুরক্ষা-বলয়ে বেষ্টন করে মা যেমন সন্তানকে রক্ষা করেন, কবিগণ তেমনি মানবসভ্যতার সর্বাঙ্গীণ সুরক্ষায় ও বিকাশে কলম শানিত করেন, ভবিষ্যতে উত্তরণের পথ নির্দেশ করেন। রবীন্দ্রনাথ মানবসভ্যতার তেমন একজন অভিভাবক। নিজের জীবনকে তিনি প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাননি, নানা ঋতু-উৎসবের প্রচলন করে প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধের সঙ্গে মনের মিলনের বন্ধনকে আনন্দময় করে তুলেছেন। বৃক্ষরোপণ, জলাশয়ের সংস্কার প্রভৃতির মাধ্যমে জীবজগতের সঙ্গে প্রকৃতির এই আদি-বন্ধনের ভারসাম্য বজায় রাখার উপায় তিনি নির্দেশ করেছেন। আমাদের তাঁর নির্দেশিত পথে চলতে হবে, তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে পরিবর্তিত যুক্তিবাদ আর বিজ্ঞানমনস্কতা।
উৎস-নির্দেশ :-
১৷ নেপাল মজুমদার, ‘ভারতের জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতা এবং রবীন্দ্রনাথ’, পঞ্চম খণ্ড, দে’জ, ১৯৭৩, পৃ ৯৭।
২। তদেব পৃ- ৯৯
৩। নেপালচন্দ্র মজুমদার, ‘রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্র’, সারস্বত লাইব্রেরী, তৃতীয় সংস্করণ-১৪০৩, পৃ ৯০
৪। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাসিক বসুমতী, ফাল্গুন ১৩৫৭,পৃ ৬৩৭
৫। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘অরণ্যদেবতা, ‘পল্লীপ্রকৃতি’, ১৭ই ভাদ্র, ১৩৪৫