হলুদ পাখি

সুচন্দ্রনাথ দাস

আকাশে একটা আয়তাকার ঘুড়ি উড়ছে। তার দীর্ঘ লেজুড়টা অবিরাম কাঁপছে। বিলাস তাদের উঠোনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ উড়ন্ত ঘুড়িটাকে দেখে। তার মনে খুব ইচ্ছে জাগে, মাঠের ধারে গিয়ে দেখবে, কে বা কারা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। 

তটিনী রান্নাঘরে রান্নার কাজে ব্যস্ত। বিলাস তটিনীর কাছে এসে দাঁড়ায়। তটিনী বিলাসকে কুমড়ো ফুলের দুটো বড়া খেতে দেয়।

একটা বড়ার একটু খেয়ে বিলাস বলে, মা গো! তুমি বেশ ভাল বড়া ভাজতে পারো!

—তোর খেতে ভালো লেগেছে?

—খুব ভালো লেগেছে!

তটিনী খুব খুশি হয়। সে নিঃশব্দে একটু হাসে। বিলাস বলে, মা গো! আমার পড়া হয়ে গেছে। আমি একটু মাঠের দিকে যাব।

—যা। বেশিক্ষণ থাকবি না।

বাড়ি থেকে দু-মিনিট হাঁটতেই বিলাস মাঠের ধারে চলে আসে। অন্য পাড়ার তমাল পাল আর কৌশিক পাল জমিতে বসে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। তমাল বা কৌশিকের সঙ্গে বিলাসের সদ্ভাব নেই। তাই বিলাস তাদের কাছে যায় না।

মাঠের ধারে মন্টুদের বাগান। মন্টুদের বাগানের একটা আমগাছে বসে একটা হলুদ পাখি মিষ্টি স্বরে ডাকছে। বিলাস পাখির ডাকে খুব আকৃষ্ট হয়। সে হাঁটতে হাঁটতে বাগানের ধারে আসে। হলুদ পাখিকে সে আগে কখনও দেখে নি। তাই সে অবাক হয়ে পাখিটাকে দেখে। পাখির ডাক শুনে মুগ্ধ হয়ে যায়।

হলুদ পাখি এগাছে-ওগাছে উড়ে বেড়ায়। একটু থেমে থাকার পর আবার ডাকে। পাখিটা মন্টুদের বাগানে কুড়ি মিনিট থাকে। বিলাসও কুড়ি মিনিট বাগানের ধারে ঘুরে বেড়ায়। 

আধঘণ্টা পরে বিলাস বাড়ি ফেরে।

তটিনী জানতে চায়, বিলাস! এতক্ষণ কোথা ছিলি?

—মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে একটু ঘুড়ি ওড়ানো দেখছিলাম। মা গো! তারপর মন্টুদের বাগানে একটা হলুদ পাখি দেখলাম। পাখিটা খুব সুন্দর স্বরে ডাকে। পাখিটার ডাক শুনতে আমার খুব ভালো লাগছিল। তাই একটু দাঁড়িয়ে থেকে হলুদ পাখির ডাক শুনছিলাম।

—পাখিটার মাথার রঙ কী?

—কালো।

—ওটা বেনেবৌপাখি।

—বেনেবৌ। বাঃ! কী সুন্দর নাম!

—বেনেবৌপাখি কী বলে ডাকে, জানিস?

—না। কী বলে ডাকে?

—’গৃহস্থের ভাল হোক।’

উচ্ছ্বসিত খুশিতে বিলাস একটু হাসে।

তটিনী বলে, বেনেবৌ আমার প্রিয় পাখি। বিস্মিত হয়ে বিলাস বলে তাই!

—হ্যাঁ। আগে আমাদের বাগানেও খুব বেনেবৌপাখি আসত।

—এখন আসে না কেন?

—পাখিরা খাবারের সন্ধানে এ-বাগানে সে-বাগানে ঘুরে বেড়ায়। কখন কোন বাগানে যাবে, ঠিক থাকে না। আমাদের বাগানেও কখনও আসে। আমরা খেয়াল করি না। তখন হয়তো আমরা কোথাও চলে যাই। 

পরদিন আবার বিলাস পড়ার ফাঁকে মন্টুদের বাগানের দিকে আসে। তার বয়স এগারো বছর। সে সরকারি স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ে। পাড়ার মন্টু, লিপিকা, রমেশও তার সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ে।

মাঠের ধারে আধঘণ্টা ঘোরাঘুরি করার পর বিলাস একটা বেনেবৌপাখির ডাক শুনতে পায়। সে উৎকর্ণ হয়ে পাখির ডাক শোনে। হলুদ পাখির ডাকের কথা সে ভালোভাবে বুঝতে পারে।

বেনেবৌপাখি ডাকছে, গৃহস্থের ভাল হোক।

পাখির ডাক অনুসরণ করে বিলাস লিপিকাদের বাগানের ধারে আসে। পাখির উদ্দেশ্যে সে বলে, ও বেনেবৌপাখি। আমাদের বাগানে যাস না। আমাদের বাগানের গাছে এখন পাকা পিয়ারা, সবেদা আর আতা আছে। তুই মনের সুখে ফল খাবি। আমি তোকে তাড়াব না। আমি তোকে ঢিল ছুঁড়ে মারব না। 

হলুদ পাখি এ-গাছে ও-গাছে উড়তে উড়তে বিলাসের দৃষ্টির বাইরে চলে যায়। বিলাস হতাশ হয়ে বাড়িতে আসে।

একদিন একসঙ্গে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতে যেতে বিলাস মন্টুকে জিজ্ঞাসা করে, তুই হলুদ পাখি দেখেছিস? 

মন্টু বলে, হ্যাঁ। হলুদ পাখি আমাদের বাগানে প্রায় প্রতিদিন আসে।

—তাই!

—আমাদের বাগানে অনেক রকমের পাখি আসে। সব পাখির নাম জানি না। মাছরাঙা, বক, ডাহুক, ফিঙে, ঘুঘু, বুলবুল পাখিকে চিনি।

—বুলবুল পাখি আমাদের বাগানেও আসে।

—তুই লক্ষ্মী পেঁচা দেখেছিস?

—হ্যাঁ। সন্ধেবেলা। দোয়েল, শ্যামাপাখিও দেখেছি।

—আমাদের এদিকে এখন কাক-শালিকপাখি কম দেখা যায়।

—এখন শহরের দিকে কাক বেশি।

একটু সাইকেল চালাবার পর বিলাস বলে, মন্টু! তোদের বাগানে হলুদ পাখি দেখতে যাব।

—যাবি।

মন্টুদের বাগানে বিলাস হলুদ পাখি দেখতে আসে। সে হলুদ পাখিকে বলে, ও হলুদ পাখি! আমাদের বাগানে যাস না।

মন্টু একটু হেসে বলে, পাখি যেন তোর ভাষা বোঝে। তোর কথা শুনবে!

বিলাস জানে যে, পাখি মানুষের ভাষা বোঝে না। সে বোকার মতো ম্লান হাসি হাসে। সে মন্টুকে জিজ্ঞাসা করে, তুই একটা হলুদপাখিকে আমাদের বাগানে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারবি?

একটু চিন্তা করে মন্টু বলে, চেষ্টা করব। আমাকে চারটে পকোড়া খাওয়াতে হবে।

বিলাস প্রতিশ্রুতি দেয়, খাওয়াব।

—এখন দুটো পকোড়া খাওয়া।

বিলাস বাজারে গিয়ে দুটো পকোড়া কিনে নিয়ে আসে। মন্টুকে দেয়। মন্টু একটা পকোড়া বিলাসকে খেতে দেয়। সে একটা পকোড়া খায়।

মন্টুদের বাগানে হলুদ পাখি এলেই মন্টু তাকে তাড়া করে বিলাসদের বাগানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। মন্টুর সঙ্গে বিলাসও মুখে ‘হুস হুস’ শব্দ করে হলুদ পাখিকে তাড়া করে।

হলুদ পাখি উড়ে অন্য দিকে চলে যায়।

বিলাস আর মন্টু দু’জনেই খুব হতাশ হয়।

সঙ্গে মন্টু না থাকলে বিলাস কান্নাকাটি করে হলুদ পাখির উদ্দেশ্যে বার বার বলে, ও হলুদ পাখি! আমাদের বাগানে একদিন যাস না। আমি তোকে খুব ভালোবাসি। আমার মাও তোকে খুব ভালোবাসে। 

এক মাস পরে। একদিন দুপুরে স্নানাহার করে তটিনী আর বিলাস বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। এমন সময় এক জোড়া হলুদ পাখি এসে বিলাসদের বাগানের একটা জামগাছে বসে; একটা হলুদ পাখি ডাকতে থাকে, গৃহস্থের ভাল হোক।

তটিনী আর বিলাস সোৎসাহে বিছানা ছেড়ে বাগানে আসে। অপার বিস্ময়ে তারা বেনেবৌ পাখি দুটোকে দেখে। তারা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে, পাখির ডাক শুনে মুগ্ধ হয়ে যায়।